

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ভোরের কুয়াশা ফোটার আগেই পাহাড়ঘেরা জনপদে নেমে আসে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। যে পাহাড় একসময় ছিল জীবিকার ভরসা, জ্বালানি কাঠ আর ফসলের আশ্রয়, এখন সেই পাহাড়ই হয়ে উঠেছে ভয় আর অনিশ্চয়তার আরেক নাম।
ঘর থেকে বের হওয়া মানেই আর ফিরে আসা হবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার তিন ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ।
হ্নীলা, বাহারছড়া ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সক্রিয় অপহরণ চক্রের কারণে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জীবিকার তাগিদে চাষাবাদ করতে বা পাহাড়ে লাকড়ি সংগ্রহে গেলেই অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আর প্রশাসন বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি জানাতে গেলেই বাড়ছে মুক্তিপণের অংক, সঙ্গে আসছে হত্যার হুমকি।
সবশেষ ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছেন ছয় কৃষক। তারা গিয়েছিলেন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের মিনাবাজার পাহাড়ি এলাকায় কৃষিকাজ ও লাকড়ি সংগ্রহ করতে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সকালে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত তাদের জিম্মি করে পাহাড়ের ভেতরে নিয়ে যায়। দু’দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি।
এ ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে মিনাবাজার বাজার কোনাপাড়া এলাকায়। অনেকেই এখন আর মাঠে যেতে সাহস করছেন না। কৃষিজমি পড়ে আছে অনাবাদি, ঘরে নেই নিয়মিত আয়।
মিনাবাজারের বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, সকালে কাজ করতে গিয়েছিল ছয়জন। পরে মোবাইলে জানতে পারি, তাদের পাহাড়ে ধরে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে কোনো খোঁজ নেই।
স্থানীয় সরওয়ার কামাল জানান, অপহরণকারীরা প্রথমে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। কিন্তু পরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার খবর পেয়ে সেই দাবি বাড়িয়ে আট লাখ টাকায় নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, আমরা যদি প্রশাসনকে জানাই, তখন ওরা বলে টাকা বাড়বে, মানুষও মারবে। তাহলে আমরা যাব কোথায়?
মিনাবাজার এলাকার বিধূ ভূষণ নাথের কণ্ঠে অসহায়ত্ব স্পষ্ট। তিনি বলেন, মুক্তিপণের কথা বাইরে জানালে অপহরণকারীরা ফোন দিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। প্রশাসনকে জানালেও বিপদ, না জানালেও বিপদ। আমরা মাঝখানে পড়ে গেছি।
স্থানীয় কবির আহমেদ বলেন, আমরা গরিব মানুষ। সামান্য চাষাবাদ করে খাই। এখন অপহরণের ভয়ে অনেক জমি চাষই হচ্ছে না। আর নাফ নদীতে মাছ ধরতে যেতেও ভয় লাগে, ওদিকে আবার আরাকান আর্মির ভয়। আমাদের আয়ের সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একদিকে সীমান্তঘেঁষা নদীপথে সশস্ত্র গোষ্ঠীর আতঙ্ক, অন্যদিকে পাহাড়ে অপহরণ চক্র- দুই দিক থেকেই চাপে পড়ে গেছে জনজীবন। দিন দিন বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা।
টেকনাফের হ্নীলা, বাহারছড়া ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল অনেকটাই দুর্গম। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল, বনাঞ্চল ঘন, পাহাড়ের ভেতরে অসংখ্য গিরিখাত ও লুকানোর জায়গা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নিয়মিত টহল বা অভিযান পরিচালনা করা সহজ নয়।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের প্রধান দাবি, পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় স্থায়ীভাবে র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির ক্যাম্প স্থাপন করা হোক।
মিনাবাজারের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম (৬০) বলেন, টেকনাফ বা হোয়াইক্যং ফাঁড়ি থেকে পুলিশ আসতে অনেক সময় লাগে। ততক্ষণে অপহরণকারীরা মানুষ নিয়ে পাহাড়ে ঢুকে যায়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যায় আছি। স্থায়ী ক্যাম্প ছাড়া আমাদের রক্ষা নেই।
মোস্তফা কামাল নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি না থাকলে এই চক্র থামবে না। আমরা চাই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি। তবুও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চলছে।
এলাকাবাসী জানান, এটি প্রথম ঘটনা নয়। প্রায় দুই বছর আগে একই এলাকা থেকে দুজনকে অপহরণ করা হয়েছিল।
মুক্তিপণ না পেয়ে তাদের হত্যা করা হয় বলে দাবি স্থানীয়দের। সেই স্মৃতি এখনো তাজা। ফলে বর্তমান ছয় কৃষকের পরিবারগুলো দিন কাটাচ্ছে চরম উৎকণ্ঠায়।
পাহাড়ঘেরা জনপদের মানুষগুলো এখন সন্ধ্যা নামলেই দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। ভোরে মাঠে যাবে কি যাবে না, সে সিদ্ধান্তও নিতে হয় ভয়কে সঙ্গী করে।
এক সময় যে পাহাড় ছিল জীবনধারণের অবলম্বন, এখন তা যেন মৃত্যু আর অদৃশ্য বন্দিত্বের প্রতীক। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ও দৃশ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা না হলে পুরো অঞ্চলের কৃষি ও জীবিকা আরও ভেঙে পড়বে- এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয়রা।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস বলেন, এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় অপহরণকারীরা পালানোর সুযোগ পায়।
ছয়জন অপহৃত হওয়ার বিষয়ে আমরা তথ্য পেয়েছি। কেউ লিখিত অভিযোগ না দিলেও আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি। অপহরণকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং অপহৃতদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
মন্তব্য করুন
