

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ভোলা সদর উপজেলায় নিষিদ্ধ সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত বিশেষ "খাদ্য কর্মসূচি" প্রণোদনা বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত পেশাজীবী জেলেরা সরকারি এই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হলেও তালিকায় স্থান পেয়েছে অপেশাদার ও সচ্ছল ব্যক্তিরা।
গত ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৬০ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার এই খাদ্য সহায়তা বরাদ্দ দেয়। ভোলা সদর উপজেলায় প্রায় ২৪০০ জেলের জন্য জনপ্রতি ১২ কেজি আটা, ৮ কেজি ডাল, ১০ লিটার তেল, ১৬ কেজি আলু, ৪ কেজি চিনি ও ৪ কেজি লবণ বরাদ্দ ছিল।
উপজেলা মৎস্য প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পুরো জেলায় প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার জেলে এই সহায়তার আওতায় আসার কথা। গত ২৪ এপ্রিল সকালে ভোলা সদর উপজেলা পরিষদ হলরুমে জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনের পর মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, মৎস্য অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনসহ অপ্রকৃত জেলেদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
ভোলা সদরের রাজাপুর, পূর্ব ইলিশা, ধনিয়া, শিবপুর, ভেদুরিয়া ও ভেলুমিয়া ইউনিয়নের বহু প্রকৃত জেলে বর্তমানে খাদ্য সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শিবপুর ইউনিয়নের হতদরিদ্র জেলে মো. জামাল মাঝি, মো. আমানউল্লাহ মাঝি, মো. আজিজুল মাঝি ও প্রতিবন্ধী জেলে মো. হারুন মাঝি জানান, তালিকা প্রণয়নের সময় তাদের জেলে কার্ড সংগ্রহ করা হলেও চূড়ান্ত তালিকায় তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, তালিকায় স্থান পাওয়া অনেকেই জেলে পেশার সঙ্গে মোটেও সম্পৃক্ত নন। অভিযোগ রয়েছে, সদর মৎস্য অফিসের অফিস সহকারী মো. ইউসুফের সহায়তায় তার আপন দুই চাচা—রাজমিস্ত্রী আ. রব ও ব্যবসায়ী মো. আবদুল মালেক—তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে সরকারি খাদ্য সহায়তা গ্রহণ করেছেন। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে অফিস সহকারী ইউসুফ দাবি করেন, তার চাচাদের নাম কীভাবে তালিকায় এসেছে এবং তারা বর্তমানে কী পেশায় নিয়োজিত তা তিনি জানেন না।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মৎস্য অফিসের স্টাফ ও রিভারগার্ড মো. জাফরের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জাফর তার শ্বশুর, ভায়রা, পিতাসহ নিজের নামও একাধিক তালিকায় ব্যবহার করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অর্ধশতাধিক অপেশাদার ব্যক্তিকে তিনি মালামাল তুলে দিয়েছেন। এছাড়া তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখা এবং অনলাইন ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার নামে তিনি জেলেদের কাছ থেকে ২০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছেন।
জাফরের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন পেশার মানুষকে জেলে কার্ড পাইয়ে দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন নদীতে অবৈধভাবে মাছ শিকারের সুযোগ করে দেওয়ার পুরোনো অভিযোগও রয়েছে। তবে অভিযুক্ত রিভারগার্ড মো. জাফর টাকা নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে দাবি করেন।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা ক্ষুদ্র মৎস্য ও জেলে সমিতির সভাপতি মো. গিয়াসউদ্দিন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা সর্বপ্রথম প্রকৃত জেলেদের একটি খসড়া তালিকা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের সাথে কোনো পরামর্শ না করে মৎস্য অফিসের স্টাফ জাফর, মামুন ও এরশাদরা মিলে অধিকাংশ অপেশাদার লোকের নাম চূড়ান্ত তালিকায় ঢুকিয়েছে। বিশেষ করে শিবপুর ইউনিয়নে ২৭০টি নামের বিপরীতে জাফর ২০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়ে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও কাঠমিস্ত্রিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে।"
ত্রাণ না পেয়ে বেদে সম্প্রদায়ের এক নারী জেলে অশ্রুভেজা চোখে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ঐ স্যার আমারে মালামাল দিব কইয়াও দিল না! স্বামীডায় আইজ অনেকদিন ধইরা অসুস্থ, নৌকায় কোনো খাবার নাই। আল্লাহ্ এর বিচার করব।"
সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ভোলা সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, “তড়িঘড়ি করে তালিকা প্রস্তুত করার সময় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কিছু অপেশাদার জেলের নাম যুক্ত হয়েছে। এ জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি।”
তবে এর দায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চাপিয়ে তিনি আরও বলেন, “চূড়ান্ত তালিকা আসার পর বিভিন্ন ইউনিয়নের নেতারা এসে আমাকে প্রভাবিত করে কিছু নাম বাদ দিতে বাধ্য করেছেন এবং তাদের নিজেদের নেতাকর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে শতাধিক নামের মালামাল নিয়ে গেছেন।”
স্টাফ জাফরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “টাকা নেওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আর তার নিজের নামে কোনো জেলে কার্ড থাকলে তা বাতিল করা হবে।”