শনিবার
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুমের পাকা ধান কাটা শুরু, সবুজ পাহাড় এখন সোনালি রঙে রঙিন

বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
expand

সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে এখন সোনালি আভা। পাহাড়ের ঢালে ঢালে চলছে জুমের পাকা ধান কাটার উৎসব। কোথাও জুমের ধান কাটার ধুম, কোথাও পাকা ধান পাহারায় জুমচাষিরা। আবার কোথাও কোথাও জুমে ধান এখনো সবুজ।

চোখের দৃষ্টি যতদূর যায়, বিশাল সবুজ পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে জুমের পাকা সোনালি ধান। পাকা ধানের সঙ্গে জুমের ফসল ঘরে তোলার ব্যস্ততাও শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখন জুমচাষিদের দম ফেলার ফুরসত নেই। প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে পাহাড়ের ঢালু ভূমিতে চাষ করা জুমের ধান কাটা শুরু হওয়ায় জুমিয়াদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি।

চলতি বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় জুমের ধান বপনে খুব বেশি ব্যবধান হয়নি। ফলে অনেক এলাকায় জুমের ফলনও তুলনামূলক এবার ভালো হয়েছে। তবে পাহাড়ি অঞ্চলে সব জায়গায় বৃষ্টিপাত সমান না হওয়ায় জুমের ধানও একই সময়ে পাকে না। যারা বৈশাখ মাসের শুরুতে প্রথম বৃষ্টির পর ধান বপন করতে পেরেছেন, তাদের জুমের ধান আগে কাটার উপযোগী হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জুমের ধান পাকার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও জুমচাষিরা ধান কাটতে শুরু করেছেন, আবার কোথাও ধান পাকার অপেক্ষায় রয়েছেন। পাকা ধান ও ফসল পাহারা দিতে অনেক জুমচাষী সপরিবারে জুমঘরে অবস্থান করছেন। কেউ ধান কাটার আগেই মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মারফা ও চিনালসহ বিভিন্ন সাথি ফসল সংগ্রহ করছেন। কেউবা পাকা ধান কাটার উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায়।

বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের যামিনী পাড়া এলাকায় শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দেখা যায়, জুমের পাকা ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমচাষীরা।

যামিনী পাড়ার বাসিন্দা রিং লট ম্রো (৫৭) সপরিবারে এবং শ্রমের বিনিময়ে কাজ করা আট নারী শ্রমিককে নিয়ে জুমের পাকা ধান কাটছিলেন। ধান কাটার ফাঁকে কথা হয় তার সঙ্গে।

রিং লট ম্রো জানান, চলতি বছর তিনি তিন ‘আড়ি’ বীজের ধান দিয়ে প্রায় তিন একর পাহাড়ি জমিতে জুম চাষ করেছেন। তার হিসাবে এক আড়ি সমান প্রায় ১০ কেজি ধান।

রিং লট ম্রো বলেন, আগে সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হলে জুমের ধান ভালো হতো। এখন সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হয় না। প্রকৃতিও যেন উল্টো হয়ে গেছে। তারপরও এ বছর জুমের ফলন নিয়ে তিনি আশাবাদী।

তার আশা, তিন একর জুম থেকে এবার প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ আড়ি ধান পাওয়া যাবে। ফলন আরও ভালো হলে আড়াইশ আড়ি পর্যন্ত ধান পাওয়া সম্ভব হতো।

২৫ বছর পুলিশে চাকরি করার পর চলতি বছরের জুন মাসে অবসর নিয়েছেন রিং লট ম্রো। অবসরের পর বসে না থেকে বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী পেশা জুম চাষে ফিরেছেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘জুমে শুধু ধান হয় না। বেগুন, মারফা, তিল, যব, ভুট্টা, চিনাল, মরিচ, রোজেলাসহ ৩০-৩৫ ধরনের ফসল হয়।

জুমের ধান কাটার কাজে ব্যস্ত নারী শ্রমিক সংডং ম্রো (১৯)। তিনি বলেন, ‘জুম না করলে আমরা কী খাবো? জুম করতেই হবে। প্রতিবছর আমরা জুম চাষ করি। এটা আমাদের ঐতিহ্য।’

এই চাষী জানান, জুমে ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, মারফা, বেগুন, ভুট্টা, তিল, মরিচ, ঢেঁড়সসহ ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসল উৎপাদন করা হয়। এসব সাথি ফসল নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে কিছু অর্থও আয় করেন জুমচাষীরা।

জুম চাষ মূলত প্রকৃতি ও মৌসুমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা একটি দীর্ঘ কৃষি প্রক্রিয়া। প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পরবর্তী বছরের জুম চাষের জায়গা নির্বাচন করা হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত পাহাড়ি এলাকায় জঙ্গল কাটা শুরু হয়।

কাটা জঙ্গল রোদে শুকানোর পর মার্চ-এপ্রিল মাসে নির্দিষ্ট জায়গায় ‘ফায়ারিং লাইন’ তৈরি করে আগুন দিয়ে জঙ্গল পোড়ানো হয়। এরপর পুরো এপ্রিল মাসজুড়ে জুমের জায়গা পরিষ্কার করে ধান ও সাথি ফসল বপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

প্রথম বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকেন জুমচাষীরা। বৈশাখের শুরুতে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি হলে জুমে ধানসহ বিভিন্ন সাথি ফসলের বীজ বপন করা হয়। যারা প্রথম বৃষ্টির পর দ্রুত বীজ বপন করতে পারেন, তাদের জুমের ধান আগে পাকে। আর যারা কিছুটা দেরিতে বপন করেন, তাদের ধানও দেরিতে কাটার উপযোগী হয়।

সাধারণত আগস্টের শেষ অথবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জুমের ধান কাটা শুরু হয়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ। ধান শুকানোর পর জুমঘর থেকে মূলঘরে ধান স্থানান্তর করা হয়। এরপর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাহাড়ি জনপদে ঘরে ঘরে চলে জুমের ধানের নবান্ন উৎসব। নতুন ধানের ভাত ও নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় এই উৎসব।

পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন তাই চলছে ধান কাটার উৎসব। সোনালি ধানের শীষে ভরে উঠছে জুমঘর। বছরের দীর্ঘ শ্রমের ফসল ঘরে তোলার আনন্দে ব্যস্ত পাহাড়ের মানুষ। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা জুমচাষীদের কাছে এই ধান শুধু খাদ্য নয়- এটি তাদের জীবন, জীবিকা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের অংশ। বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রতিবছরই জুম চাষের পরিমাণ বাড়ছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ১৬২ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৯৫৬ মেট্রিক টন। ওই বছর ৮ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে জুম আবাদ হয়ে উৎপাদন হয় ১০ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৭১ মেট্রিক টন।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৪৮৭ হেক্টর এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার ৬২৪ মেট্রিক টন। ওই বছর ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টর জমিতে জুম আবাদ হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৪৯৯ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন চাল।

আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর। একই পরিমাণ জমিতে আবাদ হয়েছে বলে কৃষি বিভাগের তথ্য। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টন চাল। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় জুমের পাকা ধান কাটা চলমান রয়েছে।

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর বলেন, ‘চলতি বছর বান্দরবানে প্রায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। জুমে ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফসলও উৎপাদন হয়ে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘এ বছর জুমের ফলন ভালো হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। তবে পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় সব জায়গায় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। ফলে একেক এলাকার ফলন একেক রকম হয়।’

এই কৃষি কর্মকর্তা জানান, বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকায় ইতোমধ্যে জুমের পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য উপজেলাতেও ধান কাটা শুরু হবে।

জুমের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকে জানিয়ে কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর বলেন, ‘স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উন্নত ও হাইব্রিড জাতের ধান উৎপাদনে জুমচাষীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank