সোমবার
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রামপালে চর ভরাটি জমি বেদখল, সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব 

রামপাল (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম
রামপালে চর ভরাটি জমি
expand

বাগেরহাটের রামপালে চরভরাটি বিপুলপরিমাণ জমি দখল নিতে চলছে মহাউৎসব। দীর্ঘদিন জেগে ওঠে ওইসব সরকারি চর প্রভাব খাটিয়ে ইচ্ছে মতো সীমানা নির্ধারন করে নেওয়া হচ্ছে ব্যক্তি মালিকানার দখলে। ফলে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব, হারাচ্ছে সম্পত্তি।

এছাড়াও তথ্য গোপন রেখে নিজস্ব নামে করা হয়েছে রেকর্ডও। এসব বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে রামপাল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর পরপর দুটি অভিযোগপত্র দেন ওই এলাকায় বসবাসরত ভূমিহীনরা। পরবর্তীতে ১২ আগষ্ট ভূমি মন্ত্রীসহ ৫/৬ টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পূণরায় দেওয়া হয় দরখাস্ত। চর ভরাটি জমি দখল নিতে হামলার ঘটনায় হয়েছে মামলাও।

‌সরকারি জমি দখলের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে ও মামলা সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়ন ও বাঁশতলী ইউনিয়নের বড়দিয়া গ্রামের গড়ে ওঠে বিপুল পরিমাণ চর ভরাটি জমি সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে দখল দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

খুলনা জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা খাঁন মোতাহার হোসেন, মিলন খাঁন, মোয়াজ্জেম খাঁন, আসাদ খাঁন, মাহামুদ শেখ, ইমামুল শেখ,জুয়েল মীর, বিশ্বজিৎ মন্ডল, জাহাঙ্গীর শেখ প্রভাব খাটিয়ে বসবাসরত ভূমিহীনদের উচ্ছেদের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ প্রায় ২০ থেকে ২৫টি ভাসমান পরিবার ৩০/৩৫ বছর ধরে ওই চর ভরাটির জমিতে বসবাস করে আসছে। দখল নিতে ওই পরিবারগুলোর উপর করা হয়েছে হামলা ও অগ্নিসংযোগ। এতে বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয় এবং পুড়ে ছাই হয় গবাদিপশু, ছাগল, হাঁসমুরগিসহ বিভিন্ন স্থাপনাও।

বড়দিয়া মৌজার এসএ ৬১ নং খতিয়ানের ৩৯৮, ৪১৪, ৪১৩, ৪১৫ দাগ ও একই মৌজার এসএ ১০৪ নং খতিয়ানে ৪১২, ৪০৫, ৪১০, ৪১১ দাগের সম্পত্তি মূলত সিকস্তি। যার বিআরএস ১৯, ২০৬, ২২৬, নং খতিয়ানের ৯৪৪, ৯১২, ৯১৩ নং দাগের সম্পত্তি। অথচ, তথ্য গোপন করে ওই সব দাগ উল্লেখ করে বিপুল পরিমাণ সিকস্তি জমি রেকর্ড করিয়ে নেয় খাঁন মোতাহার হোসেন ও তার ভাইয়েরা।

চর ভরাটি জমি নিয়ে ২০২০ সালে ২৭ জুলাই রামপাল সদর ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ শেখ ৫৮ নং স্মারকে রামপাল সহকারী কমিশনার বরাবর একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ৯৬ নং ছোট কাঠালী মৌজার এস, এ ৩৩৯ নং খতিয়ানের ১০৩ নং দাগের ৫.৩৩ একর জমির মধ্যে ২.৮০ একর জমি কুমারখালী নদীতে সিকত্তি হয়ে পুনরায় কুমারখালী নদীর উত্তর পাশে পয়ছি হয়েছে।

বর্তমান জরিপে উক্ত জমি বাংলাদেশ সরকার পক্ষে জেলা প্রশাসক। ওই জমি ১ নং খাস খতিয়ানে প্রিন্ট প্রকাশিত হয়েছে এবং গেজেটের অপেক্ষায় আছে। উক্ত জমি. নিয়ে বিজ্ঞ রামপাল সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানী ১৭৮/২০১০ নং মামলা দায়ের পূর্বক আনছার আলী দিং রায় প্রাপ্ত হয়েছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ১৩৫/৭২ ও ১৩৭/৭২ নং অধ্যাদেশ মোতাবেক নদী বা সমুদ্র সরে যাওয়ার কারনে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত জমি সরকারের মালিকানায় অন্তর্ভুক্ত হবে এবং ১৫/৮৪ নং সংশোধনী মোতাবেক এসব জমি নিয়ে মামলা থাকলে সেসব মামলা বাতিল হবে এবং ভবিষ্যতে মামলা করাও যাবে না।

এছাড়াও ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর রামপাল উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মো. কামাল হোসেন সরেজমিনে গিয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, রামপাল উপজেলাধীন কামরাঙ্গা মৌজা সংলগ্ন মোংলা নদী এবং ছোট কাঠালী মৌজা সংলগ্ন কুমারখালী নদী ভরাটি চর জমি ছোট কাঠালী মৌজার ১ নং দাগে ১৪.৯১ এবং ২০২ দাগে ১৪.৫৮ একর সর্বমোট ২৯.৪৯ একর চর জমিতে পরিণত হয়েছে এবং বর্তমান প্রবাহিত নদীর অবস্থান থেকে ছোট কাঠালী মৌজায় ১০৩-২০৫, ২১৪-২২১, ৪, ৪৪, ৮৭-১০৪ দাগে সিকস্থী পর পয়স্থী ৩৬.৫২ একর অর্থাৎ সর্বমোট (২৯.১৯+৩৬.৫২ একর) ৬৬.০১ একর খাস জমির সৃষ্টি হয়েছে যা ১ নং খাস জমি হিসাবে বিভিন্ন সময়ে ভূমিহীনদের মাঝে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে।

উক্ত নদী ভরাটি চর এবং সিকন্থী পর পয়স্থীকৃত জমি ১ নং খতিয়ানভূক্ত বর্তমান জরিপে ১ নং খাস জমিতে রেকর্ড হওয়া জরুরী। উক্ত চর জমি এবং সিকস্থী পর পয়স্বীকৃত জমি আবেদনে বর্ণিত ব্যক্তিগণ অবৈধ ভোগদখল করে রেকর্ড করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

এছাড়া, বড়দিয়া মৌজায় বর্তমান জরিপে খাস খতিয়ানভূক্ত যে সকল জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হয়েছে তা বাতিল করার প্রস্তাব/সংশোধন করা যেতে পারে। তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালাউদ্দিন দীপু রামপাল উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস বরাবর ৬২৪/১ নং স্মারকে নদী ভরাটি চর এবং সিকস্থী পর পয়স্বীকৃত জমি ১ নং খাস জমিতে রেকর্ড ও সিকস্থী পর পয়স্বীকৃত জমি ব্যক্তিগণ অবৈধ ভোগদখল করে রেকর্ড করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকায় বড়দিয়া মৌজায় বর্তমান জরিপে খাস খতিয়ানভূক্ত যে সকল জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হয়েছে তা বাতিল করার প্রস্তাব/সংশোধন হওয়া আবশ্যক মর্মে একটি পত্র দেন।

এবিষয়ে ভুক্তভোগী ও ভূমিহীন আকলিমা বেগম, মোজাহের মোল্লা, মোন্তাজ মোল্লা, শরিফুল মোল্লা, রসিদ মোল্লা, সাকিব জানান, আমরা প্রকৃত ভূমিহীন। আমরা দীর্ঘ ৩০/৩৫ বছর সরকারি খাস জমিতে শান্তিপূর্ণ ভোগ দখলে আছি। যেহেতু এই জমি আমাদের নয় তাই সরকার চাইলে তাদের প্রয়োজনে আমাদের উচ্ছেদ করতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিরা এই জমি দখল দিতে আমাদের উপর হামলা, ভয়ভীতি ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করতে পারে না। মূলত খুলনা জেলা সমাজসেবা অফিসার খাঁন মোতাহার হোসেন ক্ষমতার দাপটে আমাদের উচ্ছেদ করতে চায়। অথচ তারাই খাস জমি দখলে রেখেছে প্রায় ৪০/৫০ বিঘা। বিচার পেতে বাগেরহাট বিঞ্জ আদালতে একটি সিআর মামলা করেছি, যার নং- ২৩৯/২৬।

এবিষয়ে অভিযুক্ত খাঁন মোতাহার হোসেন এনপিবি নিউজকে বলেন, যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে তারা মিথ্যা বলেছে। আমি সিকস্তি কোনো জমি রেকর্ড করি নাই। দলিল মুলে আমরা ওই জমির মালিক। আর মারপিটও করিনাই। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।

এবিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ চক্রবর্তী এনপিবি নিউজকে জানান, কমিশনার স্যার বরাবর একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তের নির্দেশ আসছে। আমি ইতিমধ্যে নায়েব ও সার্ভেয়ারকে ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে সরেজমিনে গিয়ে স্কেচ ম্যাপসহ প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছি। তথ্য গোপন করে কেউ সরকারি জমি রেকর্ড করলে উর্ধতন স্যারদের সাথে কথা বলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারি জমি অবৈধ দখলের কোনো সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য, শুধু পেড়িখালি বা বাঁশতলী নয় উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে অধিকাংশ বিপুলপরিমাণ চর ভরাটি জমি ভূমিদস্যুদের দখলে। সেখানে তারা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দিচ্ছে লিজও। সচেতন মহলের দাবি সরকার এই সব জমি আদৌ উদ্ধার করতে পারবে কিনা সেবিষয়ে দেখা দিয়েছে চরম সংশয়।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank