


বাগেরহাটের চিতলমারীতে মোবাইল ফোনের আলোয় প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে প্রসূতি লাভলী ঘরামীর অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগের ঘটনায় মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। গুরুতর অসুস্থ লাভলীর উন্নত চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্যাকমো অমিত মণ্ডল, পরিচালক সাব্বির আহম্মেদ রুপম ও রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত চিতলমারী উপজেলা পরিষদ চত্বরে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার তিন শতাধিক নারী-পুরুষ অংশ নেন।
এর আগে সকাল ১১টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনের উদ্যোগ নেন স্থানীয়রা। আয়োজকদের অভিযোগ, সেখানে রুপমের বড় ভাই জয়নুল পারভেজ সুমন নিজেকে যুবদল নেতা পরিচয় দিয়ে মানববন্ধনে বাধা দেন। এ সময় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদেরও বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
পরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সোনালী বৈদ্য, প্রহর কান্তি সরকার, লক্ষ্মী রানা, সুমন করাতী, মো. ওয়াবায়দুল্লাহ, শাহা আলম ও মো. সালমান শেখ।
বক্তারা অভিযোগ করেন, মোবাইল ফোনের আলো জ্বেলে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে লাভলী ঘরামীর অস্ত্রোপচার করা হয়। তাদের দাবি, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসায় গাফিলতির কারণে লাভলীর জরায়ু কেটে ফেলা হয়েছে এবং মূত্রথলিতে ছিদ্র হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর জন্ম নেওয়া নবজাতক সন্তানও মারা গেছে। বর্তমানে লাভলী গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুশয্যায় রয়েছেন বলেও দাবি করেন তারা।
বক্তারা বলেন, একজন প্রসূতির অস্ত্রোপচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কার্যক্রমে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, বিদ্যুৎ, জেনারেটরসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। অস্ত্রোপচারের সময় কারা উপস্থিত ছিলেন এবং চিকিৎসায় কোনো অনিয়ম বা গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, চিতলমারী উপজেলার চরবানিয়ারী ইউনিয়নের রানাপাড়া গ্রামের শমরেস ঘরামীর স্ত্রী লাভলী ঘরামী নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। প্লাসেন্টা প্রিভিয়ার কারণে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে স্থানীয় হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয় । লাভলীর স্বামী শমরেস ঘরামীর অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু না করে মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর অস্ত্রোপচার শেষ হয়।
অস্ত্রোপচারের পর একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে সাত দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শিশুটির মৃত্যু হয় বলে জানান শমরেস।
তিনি আরও জানান, অস্ত্রোপচারের পর থেকেই তাঁর স্ত্রীর অনবরত প্রস্রাব ঝরতে থাকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়। পরিবারের দাবি, পরীক্ষায় লাভলীর জরায়ু কেটে ফেলা এবং মূত্রথলি ছিদ্র হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। দীর্ঘ ৩৮ দিন চিকিৎসার পর গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন।
অসুস্থ লাভলী ঘরামী বলেন, অমিত, রুপম ও রফিক এই তিনজন আমাকে অপারেশন করেছেন। অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে আমি আর কোনো ডাক্তারকে দেখিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে আমার অপারেশন করা হয়েছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে অপারেশন করছিল। আমি বিষয়টি টের পেয়েছি। আমার অবস্থা খুব খারাপ। আমার ছোট ছোট সন্তান রয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে হাবিবা ক্লিনিক এন্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক সাব্বির আহম্মেদ রুপম বলেন, স্যাকমো অমিত মন্ডল ওই রোগীর কোনো অপারেশন করেনি। আমাদের বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ওই সিজারের অপারেশন করেছেন ডা. নাসির উদ্দিন। আমরা টুকটাক রাজনীতি করি। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও অন্যান্য ক্লিনিকের মালিকগণ বিষয়টি ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছেন।
ডা. নাসির উদ্দিন বলেন, জটিল অপারেশনটি আমরা সফলভাবে শেষ করেছিলাম। রোগী সুস্থ হয়েই বাসায় ফিরেছিলেন। কিন্তু আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী না চলায় তিনি পরবর্তীতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। তার চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় আমি ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বহন করবো।
চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার বলেন, এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ আমি হাতে পেয়েছি। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এর আগেও তাদের বিরুদ্ধে অন্য একটি ঘটনার অভিযোগ পেয়ে সিভিল সার্জন পরিদর্শন করেছেন। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে।
এদিকে বাগেরহাটে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ ও দুর্ঘটনার ঘটনায় প্রশাসনের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে বাগেরহাট সদর উপজেলার পলি ক্লিনিকে পিত্তথলির অপারেশনের সময় এক নারীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় রোগীর স্বজনদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ না থাকায় তদন্ত করা হবে না বলে সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
সচেতন মহলের অভিযোগ, এক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই চিতলমারীতে প্রসূতি লাভলী ঘরামীর অস্ত্রোপচার নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসক, জনবল, অবকাঠামো, জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে নিয়মিত তদারকির দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের প্রশ্ন, চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীর মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থ হওয়ার অভিযোগ কি শুধু অভিযোগ হিসেবেই থেকে যাবে, নাকি প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে? একের পর এক এমন ঘটনা কি শেষ পর্যন্ত চাপা পড়ে যাবে?
স্থানীয়দের দাবি, রোগীর স্বজন লিখিত অভিযোগ করুক বা না করুক, চিকিৎসায় গুরুতর অনিয়ম কিংবা রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিজ উদ্যোগে বিষয়টি তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে বাগেরহাট জেলার সব বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়মিত অভিযান ও তদারকি জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন ।