


উপকূলীয় অঞ্চল রামপাল। চারিদিকে অথৈজল। নদী তীরবর্তী এলাকায় এই নোনা জলে যাদের জীবন জীবিকার উৎস মৎস্য চাষ। অথচ সময়ের কষাঘাতে বিপর্যয়ে সেই আয়োজন। শুধু তাই-ই নয় দীর্ঘ নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে অসহায়ত্ব আর জীর্ণ শরীর নিয়ে বেঁচে আছে প্রায় ১০ টি গ্রামের মানুষ। নদীর ঢেউয়ে তাদের স্বপ্নগুলো এখন উড়ে বেড়ায় আকাশে বাতাসে। তারা এখন আর ক্ষুধা নিবারন চায়না শুধু বেঁচে থাকায় আশ্রয় চায়।
বাগেরহাটের রামপালের নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ,গাছপালা, পাকা রাস্তা, বিদ্যুতের খুঁটি, পাকা ভবনসহ নানা স্থাপনা নদীগর্ভে বিলিন হয়ে দিশেহারা তারা। আবার অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুতও হয়ে চলে গেছে অন্যত্র।
রামপালের ৪টি পয়েন্টে তীব্র নদী ভাঙ্গন চলমান রয়েছে। এনপিবি'র অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মোংলা-ঘাষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেল অপরিকল্পিত খননের ফলে নদী ভাঙন তীব্র আকারে ধারণ করেছে। ফলে দীর্ঘ ভাঙনে ইতিমধ্যে ওইসব এলাকায় প্রায় শতাধিক পরিবার নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরো প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার। উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের রোমজাইপুর এলাকায় নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে বসবাসরত প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ টি পরিবার। সিংগড়বুনিয়ার রামপাল খেয়াঘাটে বিপুল অর্থে নির্মিত যাত্রী ছাওনিও ইতিমধ্যে নদী গর্ভে বিলিন হয়ে যাত্রী পারাপারে ব্যহত হচ্ছে।
এছাড়াও ওড়াবুনিয়ার রামপাল কৃষি অফিস থেকে বগুড়া ব্রীজ পর্যন্ত তীব্র ভাঙনে বিলিন হয়েছে ৪০ টি পরিবার। ঝুঁকিতে রয়েছে আরো প্রায় ২৫ থেকে ৩০ টি পরিবার। এই ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে রামপাল সরকারি ডিগ্রী কলেজও। হুড়কা ইউনিয়নের গোলারডাংগি এলাকায় নদী ভাঙ্গনে বসতবাড়ি হারিয়েছে ১৫ থেকে ২০টি পরিবার। ঝুঁকিতে রয়েছে আরো প্রায় ২০ থেকে ২৫ টি পরিবার। পাকা সড়ক বিলিন হয়েছে সব মিলিয়ে প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার। আর অতিমাত্রায় ঝুঁকিতে রয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, গাছপালা, পাকা ভবন, আধা পাকা সড়কসহ নানা স্থাপনাও। তীব্র ভাঙনের ফলে স্কুল, কলেজ বা হাট-বাজারে যাতায়াতের ব্যহত হচ্ছে সেখানকার মানুষের। এছাড়াও অসুস্থ কোনো রোগীকে দ্রুত চিকিৎসাসেবা দিতে পোহাতে হয় চরম বিড়ম্বনায়। জোয়ারের পানির চাপে রাস্তা পারাপারে নৌকাই এখন তাদের একমাত্র ভরসা।
এর আগে তৎকালীন সরকার মোংলা ঘাষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলটি সচলের উদ্দেশ্য ২০১১/২০১২ সালে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় খনন কাজ শুরু করে। খননের লক্ষ্য ছিল পরিবেশ সুরক্ষা, মোংলা বন্দর সচল ও সুন্দরবন রক্ষা। তবে পরিবেশবাদীদের দাবি ডিপিপির নকশা অনুযায়ী ওই ৮৩টি খাল ও নদী খনন করা হয়নি। ফলে নদীর স্রোতধারা বাধাগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগীরা আরও বলেন, জীবন বাঁচাতে কেউ সরকারি রাস্তার পাশে, কেউ অন্যর বাড়ি, আবার কেউ চলে গেছে এলাকা ছেড়েও। দীর্ঘ ভাঙনে সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু নগদ টাকা, শুকনা খাবার ও ঢেউ টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে অস্থায়ী এসব বিভিন্ন সামগ্রী তাদের জীবন যাপনে যতসামান্য। ভুক্তভোগীদের দাবী তীব্র নদীভাঙন মোকাবিলায় জিও ব্যাগ দিয়ে প্রাথমিক এই ভাঙন রোধ করা সম্ভব। তবে স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন নদীর বেশকিছু বাক রয়েছে যেগুলো অতি দ্রুত সোজা করে কেটে দিলে এই ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে বলে জানান তারা। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের দাবি শুধু রোমজাইপুর বা হুড়কা নয় উপকূলীয় অঞ্চল রামপালকে বাঁচাতে হলে টেকসই বেড়িবাঁধের বিকল্প নেই।
মোংলা-ঘোষিয়াখালী চ্যানেল রক্ষা সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব, এম, এ সবুর রানা জানান, মোংলা-ঘোষিয়াখালী চ্যানেলটি ২০১১/১২ অর্থবছরে খনন শুরু হয়। তৎকালিন সময় চ্যানেলটি ডিপিপি'র নকশা অনুযায়ী খনন করা হয়নি। পরিবেশ ও নদী বিজ্ঞান গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস দায়সারা গবেষণা রিপোর্ট করে। এতে অপরিকল্পিতভাবে চ্যানেলটি খনন করা হয়। যে কারণে চ্যানেলটির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নদী ভাঙ্গন দেখা দেয়। এভাবে ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে আগামী ১০/১৫ বছরের মধ্য অনেক গ্রাম মানচিত্র থেকে বিলিন হয়ে যাবে। গ্রামগুলো বাঁচাতে পরিকল্পিত গবেষণা করতে হবে। কারণ এই চ্যানেলটির স্রোত দ্বিমুখী। গ্রামবাসী ও ফসলী জমি রক্ষা করতে হলে নদীতে টেকসই ব্লক বাঁধ বা বেড়িবাঁধ প্রয়োজন।
রামপাল উপজেলা উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন শেখ বলেন, এই এলাকা নদী মাতৃক দেশ। বিগত সময় নদী খননের পর নদী সচল রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং ব্যবস্থাও চলমান রয়েছে। দীর্ঘদিন নদী ভাঙ্গনে বাড়িঘরসহ উর্বর জমি ভেঙে যাচ্ছে। প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হচ্ছে। আমাদের দাবি বাগেরহাট জেলার ৩৪/২ নং ফোল্ডার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ বাস্তবায়ন হোক।
এবিষয়ে বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল এনপিবিকে বলেন, মোংলা-ঘাষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলের রামপাল অংশে ভাঙ্গনের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি। তবে ভাঙ্গন রয়েছে মোংলার অংশেও। বর্তমানে চ্যানেলটির ৫/৬ টি পয়েন্টে ভাঙ্গন চলছে। ইতিমধ্যে ৩টি পয়েন্টে কাজ শুরু করা হয়েছে। আর রড় ভাঙ্গনের জায়গার বিষয়ে নতুন করে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এবিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম এনপিবিকে বলেছেন, মোংলা-ঘাষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলের রামপাল অংশের রমজাইপুরসহ বেশ কয়েকটি স্থানে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমি ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। অনেক গ্রামের অনেকাংশই ভেঙ্গে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। দ্রুত ভাঙ্গন রোধে পাইলিং বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। তবে চলমান ড্রেজিংয়ের প্রভাবেও ভাঙ্গছে। এছাড়া এটা আন্তর্জাতিক নৌ রুট, এ পথ দিয়ে প্রতিনিয়ত নৌযান (জাহাজ) চলাচল করছে। নৌযানের ঢেউ ও জোয়ার-ভাটার আঘাতে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হচ্ছে। পাইলিং বাঁধ করা গেলে এ ভাঙ্গন রোধ করা সম্ভব হবে। ভাঙ্গন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কার্যকরী ভূমিকা পালনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।