সোমবার
১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সন্তানদের মুখে খাবার ও ঘরভাড়া দিতে চুল বিক্রি করলেন রেহানা

বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৭ এএম আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম
রামপালে চুল বিক্রি করে সন্তানদের খাবার জোগালেন মা
expand
রামপালে চুল বিক্রি করে সন্তানদের খাবার জোগালেন মা

সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া আর মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ধরে রাখতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করেছেন বাগেরহাটের রামপালের হতদরিদ্র রেহানা খাতুন। অভাব, স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহ এবং ঘরভাড়া দিতে না পারার কষ্টে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন দুই সন্তানের এই মা।

রোববার (১০ আগস্ট) দুপুরে রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর এলাকায় খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে কথা হয় রেহানা খাতুনের সঙ্গে।

বর্তমানে রেললাইনের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে তৈরি একটি ছোট্ট ঘরে দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। ঘরটির এখনো কোনো বেড়া বা ছাউনি নেই।

এনপিবি প্রতিবেদককে রেহানা জানান, প্রায় সাত বছর ধরে সন্তোষপুর এলাকায় ভাড়া থাকতেন তিনি। স্বামী আবু জাফর দিনমজুরের কাজ করেন। তবে নিয়মিত কাজ না থাকায় সংসারে দীর্ঘদিন ধরেই অভাব-অনটন চলছে। এর মধ্যে স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহ ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ তার।

রেহানা বলেন, কয়েক মাসের ঘরভাড়া বকেয়া থাকায় বাড়ির মালিক তাদের ঘর থেকে নামিয়ে দেন। সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা এবং ঘরভাড়া পরিশোধের জন্য কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের মাথার চুল কেটে বিক্রি করেন তিনি। চুল বিক্রি করে পান ১০০০ টাকা। ৫০০ টাকা দিয়ে ঘরভাড়া পরিশোধ করেন এবং বাকি টাকা দিয়ে সন্তানদের জন্য খাবার কেনেন।

তিনি বলেন, ছেলে-মেয়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে থাকি। ঘরভাড়া দিতে আর সন্তানদের খাওয়াতে চুল বিক্রি করেছি । সেই টাকা দিয়ে ঘরভাড়া দিয়েছি, বাচ্চাদেরও খাওয়াইছি।

রেহানা আরও জানান, স্বামীর নির্যাতনে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কয়েকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। একপর্যায়ে স্বামীর সঙ্গে বিরোধের কারণে তিনি সন্তানদের নিয়ে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান।

পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতায় খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে একটি ছোট ঘর তৈরির চেষ্টা করছেন তিনি। তবে ঘরটির এখনো কোনো বেড়া কিংবা ছাউনি দিতে পারেননি। ফলে দুই সন্তানকে নিয়ে খোলা পরিবেশের মধ্যেই দিন কাটছে তার।

এর আগেও ঘর ভাড়া দিতে না পেরে চুল বিক্রি করেছিলেন রেহেনা

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রেহানাদের সংসারে দীর্ঘদিন ধরেই অভাব-অনটন চলছে। স্বামীর নিয়মিত আয় না থাকায় সংসারে প্রায়ই সংকট দেখা দেয়। স্বামীর মাদক গ্রহণের কারণেও তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হতো বলে জানান তারা।

প্রতিবেশীরা বলেন, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে এবং মাথা গোঁজার জায়গা ধরে রাখতে একজন মাকে নিজের চুল বিক্রি করতে হয়েছে এ ঘটনা অত্যন্ত কষ্টের। এর আগেও একবার রেহানা চুল বিক্রি করেছিলেন বলে জানান তারা।

তাদের দাবি, রেহানা ও তার দুই সন্তানের জন্য একটি নিরাপদ ঘর এবং নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে তারা নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাবেন।

স্বামীরও বদলে যাওয়ার দাবি

রেহানার স্বামী আবু জাফরের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। কাজের সুবাদে প্রায় আট বছর আগে বাগেরহাটে এসে প্রেম করে রেহানাকে বিয়ে করেন তিনি।

আবু জাফর বলেন, তিনি আগে মাদকাসক্ত ছিলেন। তবে গত দুই মাস ধরে মাদক ছেড়ে দিয়েছেন এবং নামাজ পড়াও শুরু করেছেন। রেহানার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

তার ভাষ্য, দুই মাস অসুস্থ থাকায় তিনি কাজ করতে পারেননি। এ কারণে সংসারে আয় বন্ধ হয়ে যায় এবং ঘরভাড়া বাকি পড়ে। সুযোগ পেলে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে শান্তিতে সংসার করতে চান তিনি।

পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রশাসন ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম

রেহানার অসহায়ত্বের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর তার পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। রামপাল উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি স্থায়ী আবাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ তামান্না ফেরদৌসি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে রেহানা খাতুনের অসহায়ত্বের খবর জানার পর প্রতিমন্ত্রী ও জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসন তার পাশে দাঁড়িয়েছে। তাকে নগদ অর্থ ও প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ঘর এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশ-বিদেশের অনেক মানুষও রেহানার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার প্রাপ্ত অর্থ নিরাপদে রাখার জন্য উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এদিকে রেহানার অসহায়ত্বের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন।

মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় রেহানা

মাথার চুল বিক্রি করে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া রেহানার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের দারিদ্র্যের চিত্র নয়; এটি সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামেরও একটি নির্মম বাস্তবতা।

রেহানার পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন ও বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলেও স্থানীয়দের প্রত্যাশা তার দুই সন্তানের জন্য নিরাপদ বাসস্থান ও একটি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা হোক। এতে রেহানা ও তার সন্তানরা অনিশ্চয়তার জীবন থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন