

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মতলব দক্ষিণে সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযানে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও কৃষক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। কৃষি অফিসারের প্রত্যয়নের মাধ্যমে ধান সংগ্রহের নিয়ম থাকলেও সে নিয়ম মানা হচ্ছে না। প্রত্যয়নের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রকৃত কৃষকরা প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে মাথাপিছু ৩ মেট্রিক টন ধান খাদ্য গুদামে বিক্রি করার সুযোগ পাওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে তারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগী চাষিদের অভিযোগ, সরকারি খাদ্য গুদামে নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষ না দিলে কোনোভাবেই ধান জমা নেওয়া হচ্ছে না।
কৃষক ফারুক আহমদ অভিযোগ করে বলেন, আমার কৃষি কার্ড আছে, আমি একজন প্রকৃত কৃষক। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্রও সংগ্রহ করেছি। এমনকি খাদ্য গুদাম থেকে ধান দেওয়ার জন্য বস্তাও দেওয়া হয়েছিল। সব ধরনের কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও আমার ধান নেওয়া হয়নি। একইভাবে আমার আপন ভাই মহসিনও ধান দিতে পারেননি।
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, যারা খাদ্য গুদামে ধান বিক্রি করতে পেরেছেন, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। আমি নিজেও গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বলেছি, আমিও টাকা দেব, আমার ধানগুলো নিয়ে নিন। কিন্তু কয়েকদিন ধরে নেব, নেব বলে ঘুরানোর পর এখন বলা হচ্ছে, আগামী বছর ধান দিতে হবে। এখন আর নেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রতিবেদকের পরিচয় গোপন রেখে মুঠোফোনে কথা হলে কৃষক সুদর্শন চন্দ্র বলেন, খাদ্য গুদামে ধান বিক্রি করতে তাকে ‘অফিস খরচ’ বাবদ ৭ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন প্রতিবেদকও যদি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রি করতে চান, তবে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। অন্য কৃষকদের কাছ থেকেও ‘অফিস খরচ’ নামে আরও বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে কত টাকা নেওয়া হয়েছে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব কথা ফোনে বলা যাবে না। আপনি কড়িতলা মোড়ে আসেন, সরাসরি কথা বলব।
কৃষক মোজাম্মেল সরকার বলেন, খাদ্য গুদামে সরকারি ভ্যাট, বস্তা ও শ্রমিক (লেবার) খরচের কথা বলে প্রতি বস্তা ধানের জন্য ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়। আমাকেও এই টাকা দিতে হয়েছে। আমি ৬৫ বস্তা ধান সরবরাহ করেছি। সে হিসেবে আমার কাছ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, খাদ্য গুদামের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, অথচ প্রকৃত কৃষকরা সব ধরনের কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ধান বিক্রি করতে পারেননি। ফলে বাধ্য হয়ে তারা খোলা বাজারে কম দামে ধান বিক্রি করে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ঘটনায় খাদ্য গুদামের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
মতলব দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চৈতন্য পাল বলেন, চলতি মৌসুমে খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির জন্য উপজেলার প্রায় ২৫০ জন আগ্রহী কৃষককে কৃষি অফিস থেকে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব কৃষকের ধান খাদ্য গুদাম কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ক্রয় করবে। কৃষি অফিসের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহের কোনো সুযোগ নেই।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক খালেদা আক্তার বলেন, ৭৫ মণ ধান বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ভ্যাট বাবদ ৫৪০ টাকা ছাড়া অতিরিক্ত কোনো টাকা নেওয়ার বিধান নেই। যদি কেউ এর বাইরে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে থাকে, তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতলব দক্ষিণ উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) একরামুল ইসলাম বলেন, “কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় কর্মসূচির আওতায় চলতি মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দরে মোট ৩০০ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। এ জন্য উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে ৪০০ জন কৃষককে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভ্যাট (আইটি) ছাড়া কৃষকদের কাছ থেকে কোনো ধরনের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় না। কোনো কৃষক যদি অফিস সহকারীকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে থাকেন, সে বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”এ সময় সাংবাদিকরা এ বিষয়ে আরও তথ্য ও বক্তব্য নিতে গেলে তিনি তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করে এই বিষয়ে কোনো নিউজ বা সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন।
মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে এম ইশমাম আহমেদ জানান, কৃষি অফিসের প্রত্যয়নের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের হতেই ধান নিতে হবে, এক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোন সুযোগ নেই, এই বিষয়ে কোন কৃষক মৌখিক অথবা লিখিত অভিযোগ দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুর রহমান খান বলেন, এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে আমি অবগত নই। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য যে চলতি মৌসুমে মতলব দক্ষিণ উপজেলায় নির্বাচিত ১০০ জন কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ও চাল ক্রয়ের অভিযানের আওতায় ৩৬ টাকা কেজি দরে মোট ৩০০ টন ধান সংগ্রহ করা হবে।
