

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


চট্টগ্রামের ভৌগোলিক আয়তনে বৃহত্তম উপজেলা ফটিকছড়িকে দ্বিখণ্ডিত করে নতুন আরেকটি প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সরকারের খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যমান ফটিকছড়ির পাশাপাশি ম্যাপে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’।
বুধবার (১ জুলাই) প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় বহুল প্রত্যাশিত এই প্রস্তাবটি পাসের জন্য উপস্থাপিত হবে বলে জানা গেছে। এটি অনুমোদিত হলে দেশে মোট উপজেলার সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৯৬-এ।
এর আগে, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির (প্রি-নিকার) সভায় নতুন এই উপজেলা গঠনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ও খসড়া অনুমোদন করা হয়েছিল। মূলত দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণ, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা ও জনসেবার মানোন্নয়নের স্বার্থে স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতেই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন উপজেলা গঠিত হলে সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দ ও বাজেট দ্বিগুণ হবে, যা মাঠপর্যায়ে জনসেবা প্রাপ্তি আরও দ্রুত ও কার্যকর করবে।
বর্তমানে ফটিকছড়ি উপজেলায় ২টি থানা (ফটিকছড়ি ও ভূজপুর), ২টি পৌরসভা (ফটিকছড়ি ও নাজিরহাট) এবং ১৮টি ইউনিয়ন রয়েছে। প্রায় ৭ লাখ জনসংখ্যার এই বিশাল জনপদকে একটিমাত্র প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে দেখভাল করা অত্যন্ত দুরূহ। তার ওপর সব প্রশাসনিক ভবন ফটিকছড়ি পৌরসভায় হওয়ায় উত্তর ফটিকছড়ির সাধারণ মানুষ ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এমনকি পুলিশি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে ভূজপুর থানা গঠন করা হলেও, সেটি উত্তরাঞ্চলে স্থাপন না করে ফটিকছড়ি থানার কাছাকাছি স্থাপন করায় আইনি সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন উত্তরের মানুষ। একইভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দক্ষিণ ফটিকছড়ির নাজিরহাট পৌরসভায় অবস্থিত হওয়ায় প্রত্যন্ত উত্তরের বাসিন্দারা জরুরি চিকিৎসা সেবা পান না। এছাড়াও, নব্বইয়ের দশকের আগে এ অঞ্চলে কোনো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। বর্তমানে কিছু সরকারি স্কুল-কলেজ থাকলেও কোনো সরকারি কলেজ নেই। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার হারও এখানে তুলনামূলক কম।
নতুন উপজেলা গঠনের খবরে উত্তর ফটিকছড়ির মানুষের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলেও, এর সদর দফতর স্থাপন এবং সীমানা নির্ধারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ধোঁয়াশা ও স্থানীয় অসন্তোষ।
একটি মহল নতুন উপজেলার সদর দফতর ভূজপুর থানা কেন্দ্রিক করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এতে ফুঁসে উঠেছেন উত্তর ফটিকছড়ির সচেতন মানুষ। তারা যৌক্তিক ও কেন্দ্রস্থলে সদর দফতর স্থাপনের দাবিতে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও আন্দোলন করে যাচ্ছেন।
সাধারণ মানুষের দাবি, সদর দফতর যেন আরও উত্তরে নারায়ণহাট ইউনিয়নের জুজখোলা মৌজায় করা হয়, যাতে সব ইউনিয়নের মানুষ সমান যাতায়াত সুবিধা পায়।
অন্যদিকে, সীমানা নির্ধারণ নিয়ে সুয়াবিল ও নাজিরহাট এলাকায় অসন্তোষ বিরাজ করছে। প্রস্তাবিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সঙ্গে বৃহত্তর সুয়াবিল ইউনিয়ন এবং নাজিরহাট পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত হবে কি-না, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। এর আগে ‘বৃহত্তর সুয়াবিল অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ এই এলাকাগুলোকে উত্তর ফটিকছড়ি থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে।
তাদের দাবি, জোরপূর্বক এগুলোকে যুক্ত করলে চরম আইনি ও ভৌগোলিক জটিলতা তৈরি হবে। এই বিরোধ নিরসনে ইতিমধ্যে প্রশাসন বেশ কয়েকটি গণশুনানিও করেছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, নতুন উপজেলা অনুমোদনের বিষয়টি সাধারণত নিকার সভায় চূড়ান্ত হয়। ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা গঠনের ফাইলটি বর্তমানে নিকার সভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সব আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদায়নের মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু হবে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য সরকারি দফতরের কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হবে।
বঞ্চনা লাঘবের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে উত্তর ফটিকছড়ির বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার সঠিক প্রতিফলন ঘটে নাকি স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আসে— এখন সেটিই দেখার অপেক্ষায় স্থানীয় সচেতন মহল।