

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ভোলায় একটি মামলার শুনানিকালে আদালতের আদেশ ভুল বুঝে এজলাসে দাঁড়িয়ে বিষপান (তরল পদার্থ) করেছেন তারাভানু (৩৫) নামে এক নারী বিচারপ্রার্থী।
বুধবার (২৪ জুন) দুপুর দেড়টার দিকে ভোলা জেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সৌরভ রায় মিঠুর আদালতে এ ঘটনা ঘটে।
অসুস্থ তারাভানু বোরহানউদ্দিন উপজেলার ছোট মানিকা গ্রামের বাসিন্দা এবং কাভার্ড ভ্যানচালক বাহার উদ্দিনের স্ত্রী। বর্তমানে তিনি ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আদালত ও আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, আজ বুধবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলার চার্জ গঠনের বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। শুনানিতে বিচারক মামলার এক নম্বর আসামি (তারাভানুর স্বামী) বাহার উদ্দিনকে মামলায় রেখে অপর দুই আসামিকে অব্যাহতি দেন। তবে আদালতের আদেশটি ভুল বুঝে বাদী তারাভানু মনে করেন তার স্বামীকেও মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই চরম হতাশায় তিনি এজলাসেই দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাগ থেকে তরল জাতীয় একটি পদার্থ বের করে মুখে ঢেলে দেন। তাৎক্ষণিকভাবে আদালতে উপস্থিত ব্যক্তিরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
এই ঘটনার বিষয়ে ভোলা কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক শেখ মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘বুধবার মামলাটির শুনানির তারিখ ছিল। আদালতের কার্যক্রম চলাকালে বাদী তারাভানু এজলাসে দাঁড়িয়ে ব্যাগ থেকে তরল জাতীয় একটি পদার্থ বের করে পান করেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে আদালতে উপস্থিত ব্যক্তিরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।’
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহের জামালপুরের মেয়ে তারাভানুর সাথে প্রায় ১৪ বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে ভোলার বোরহানউদ্দিনের বাহার উদ্দিনের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সংসারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে তারাভানু প্রায় পাঁচ বছর সৌদি আরব ও কাতারে প্রবাসজীবন কাটান। প্রবাসে থাকা অবস্থায় উপার্জিত সব অর্থ তিনি স্বামীর কাছে পাঠাতেন। তবে ২০২৩ সালে দেশে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তার পাঠানো অর্থ দিয়ে স্বামী বাহার উদ্দিন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।
পরবর্তীতে দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কথা বললে তারাভানুর ওপর শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। সবশেষ ২০২৫ সালে তার ওপর আবারও হামলার ঘটনা ঘটলে তিনি স্বামী বাহার, তার দ্বিতীয় স্ত্রী সাথী, দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মিসির খাঁ ও মা নুর নাহারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। আজ সেই মামলার শুনানিতে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা-মাকে আদালত অব্যাহতি প্রদান করেন, যা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বিষয়টিকে আকস্মিক উল্লেখ করে বলেন, ‘শুনানির এক পর্যায়ে বাহার উদ্দিনের দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা-মায়ের জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। বিষয়টি তারাভানু সঠিকভাবে বুঝতে না পেরে বা আবেগপ্রবণ হয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সঙ্গে থাকা ব্যাগ থেকে এসিড পান করেন বলে জানা গেছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিচারিক প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগও ছিল। এমন ঘটনা আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে।’
এদিকে, আদালত কক্ষে এমন সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক পদার্থ নিয়ে প্রবেশের ঘটনা আদালত প্রাঙ্গণের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ভোলা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) আরিফুর রহমান বলেন, ‘তারাভানু নামে এক নারী বিচারপ্রার্থী আদালতে এসে এসিড পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এ ধরনের ঘটনা আদালতের পরিবেশ ও বিচারব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আদালত প্রাঙ্গণে এসিডের মতো বিপজ্জনক পদার্থ নিয়ে প্রবেশ করা সম্ভব হওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও ছিল। আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা ও তল্লাশি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।’
ভিকটিমের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ জুনায়েদ হোসেন জানান, ‘তাকে দ্রুত হাসপাতালে এনে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।’