

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সরকারী হাসপাতাল বলতেই চোখে ভাসে জীর্ণ দশা আর চিকিৎসায় অবহেলার এক চেনা ছবি। কিন্তু সেই চেনা বৃত্ত ভেঙে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। যখন সামান্য জটিলতাতেই প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান সেকশন বা অস্ত্রোপচারের টেবিলে নিয়ে যাওয়ার এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে পুরো দেশজুড়ে, তখন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্বাভাবিক প্রসব বা 'নরমাল ডেলিভারি'র এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই সরকারি হাসপাতালটি।
সম্প্রতি গত বৃহস্পতিবার মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হাসপাতালটিতে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে ১৭টি শিশু! যার মধ্যে ১২টি শিশুই ভূমিষ্ঠ হয়েছে রাতের শিফটে। আর চলতি বছরে (জানুয়ারি -মে) পর্যন্ত ৫ মাসেই এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৮৯-এ। এই মাসেই (১৩ দিনে) স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে প্রায় শতাধিক সুস্থ শিশুর। সরকারি হাসপাতালের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও চিকিৎসকদের শতভাগ আন্তরিকতা থাকলে যে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার চেহারা বদলে দেওয়া সম্ভব, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
সরেজমিনে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। সুস্থ নবজাতকদের কোলে নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছেন মায়েরা। তাঁদের চোখে-মুখে স্বস্তি আর কৃতজ্ঞতা।
হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে কথা হয় দাঁতমারার ইউনিয়ন থেকে আসা কাউছার আলমের সঙ্গে। গত শনিবার বিকেলে তাঁর স্ত্রীর কোলজুড়ে এসেছে এক কন্যাসন্তান।
কাউছার আলম বলেন, "শুরুতে খুব ভয় আর দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলাম। বেসরকারি ক্লিনিকে গেলে হয়তো এতক্ষণে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে সিজার করাতে হতো। কিন্তু এখানকার ডাক্তার আর নার্স আপাদের সাহস ও ২৪ ঘণ্টার সহযোগিতায় কোনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই আমার মেয়ে পৃথিবীতে এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে আমাদের কোনো টাকাও খরচ করতে হয়নি।"
ভয় কাটিয়ে সুস্থ সন্তান প্রসব করা আরেক মা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, "নরমাল ডেলিভারি নিয়ে মনে অনেক আতঙ্ক ছিল। কিন্তু এখানকার আপারা যেভাবে সাহস ও সহযোগিতা করেছেন , তা ভোলার নয়।"
হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডের নার্সিং সুপারভাইজার কৃষ্ণা প্রভাত দেবী জানান, এখানে শুধু প্রসব নয়, বরং একজন অন্তঃসত্ত্বা মায়ের প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্যসেবা (ANC) থেকে শুরু করে প্রসব-পরবর্তী (PNC) সব ধরনের যত্ন নিশ্চিত করা হয়।
তিনি গর্বের সাথে যোগ করেন,"আমাদের এখানে এক দিনে সর্বোচ্চ ২১টি শিশুর স্বাভাবিক জন্ম হওয়ার রেকর্ডও রয়েছে।"
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (RMO) ডা. কামরুল ইসলাম জানান, দিন-রাত এক করে প্রসূতি মায়েদের এই বিশেষ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন হাসপাতালের গাইনোকোলজি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ মিডওয়াইফরা (ধাত্রী)। সরকারি হাসপাতালের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে স্বাভাবিক প্রসবের হার আরও বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মাতৃমৃত্যুর হার কমানো এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিতকরণে অসামান্য অবদানের জন্য ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ইতিমধ্যে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে একাধিকবার শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার লাভ করেছে।
সার্বিক বিষয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল আলম বলেন,"আমরা শুধু চিকিৎসা দিই না, মায়েদের মানসিকভাবে প্রস্তুত ও উৎসাহিত করি যেন তারা নরমাল ডেলিভারির ওপর আস্থা রাখেন। আমাদের দক্ষ টিমটি ২৪ ঘণ্টা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সিজারিয়ানের বাণিজ্যিক প্রবণতা রুখে সরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।"