


কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে পাহাড় কেটে ইট ও লোহা দিয়ে ঘর নির্মাণের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা বলছেন, অস্থায়ী আশ্রয়ের জন্য গড়ে ওঠা ক্যাম্পে স্থায়ী ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ শুধু পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বরং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের ৪ নম্বর এক্সটেনশন ক্যাম্পের ই-ব্লকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তত্ত্বাবধানে ৮৮৮টি শেল্টার নির্মাণের কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের জন্য পাহাড় কেটে প্রায় ১০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি আশপাশের পাহাড় কেটে সমতল করে গড়ে তোলা হচ্ছে শেল্টারগুলো। ইট ও লোহার কাঠামো ব্যবহারের কারণে এসব ঘরকে ‘স্থায়ী আবাসন’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এতদিন বাঁশ, ত্রিপল ও টিননির্ভর অস্থায়ী ঘরই ছিল সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু এখন সেখানে ইট-লোহার কাঠামোয় নির্মাণকাজ স্থানীয়দের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, এটি শুধু ঘর নির্মাণ নয়- বরং দীর্ঘমেয়াদি বসতির ইঙ্গিত।
একাধিক বাসিন্দা জানান, দিন-রাত চলমান এই নির্মাণকাজের ফলে পাহাড় কাটা দৃশ্যমান হলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সন্দেহ ও অসন্তোষ আরও বাড়ছে।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, যে ধরনের কাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, তা স্পষ্টতই স্থায়ী ঘরের মতো। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের এখানে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পথ তৈরি করা হচ্ছে। এতে প্রত্যাবাসন আরও জটিল হয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা হলে বর্ষায় ভূমিধসসহ বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কুতুপালং এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্ষার ঠিক আগমুহূর্তে পাহাড় কাটায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এতে শুধু ক্যাম্প নয়, আশপাশের এলাকাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। পাশাপাশি স্থায়ী ঘর নির্মাণ হলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
এদিকে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি ও শেল্টার নির্মাণের কয়েকটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া এসব দৃশ্যে নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, অস্থায়ী আশ্রয়ের নামে কীভাবে এমন স্থায়ী ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে এবং পাহাড় কাটা নিয়ে কেন কোনো দৃশ্যমান জবাবদিহি নেই। কেউ কেউ এটিকে পরিবেশের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে বলছেন- এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাফ্ফাত ফারদিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। কিন্তু যদি এখানে স্থায়ী আবাসন তৈরি করা হয়, তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই ফিরে যেতে অনাগ্রহী হয়ে পড়বে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মান্নান বলেন, শুরুতে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ীভাবে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় রাখার পরিকল্পনা থাকলেও পরে তাদের পাহাড়ি এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। এখন সেখানে স্থায়ী ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নতুন প্রশ্ন তুলছে। দ্রুত এই নির্মাণকাজ বন্ধ না হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
উখিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এতদিন ক্যাম্পের সব ঘরই ছিল অস্থায়ী। এখন হঠাৎ করে ইট-লোহার কাঠামো তৈরি হওয়ায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই উদ্বেগ দূর করতে হলে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা জরুরি।
বিষয়টি নিয়ে ইউএনএইচসিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোশারফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ছুটির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয়। পরবর্তী কার্যদিবসে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত সংস্থাটির পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান গণমাধ্যমে বলেন, সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পে কিছু শেল্টার নির্মাণের তথ্য তারা পেয়েছেন। তবে পাহাড় কাটার অভিযোগ সংস্থাটি অস্বীকার করেছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ক্যাম্প-ইন-চার্জকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, নির্মাণাধীন ঘরগুলো স্থায়ী নয়। ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ঘর সরিয়ে সেখানে নতুন শেল্টার তৈরি করে একই বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব ঘর ভবিষ্যতে স্থায়ী রূপ নেবে কি না- সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ আট বছরেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যত শুরু না হওয়ায় অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাখাইনের সংঘাত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় ক্যাম্পে ইট-লোহার কাঠামো নির্মাণ স্থানীয়দের কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
মন্তব্য করুন