

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


গাজায় শান্তি ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন পর্ষদ গঠন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই পর্ষদের নেতৃত্বে থাকছেন ট্রাম্প নিজেই। এতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে ব্লেয়ারের যুক্ত হওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে, ব্যাপক বিতর্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের কাঠামোতে উনিশ শতকের উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। আলজাজিরা ও রয়টার্স
হোয়াইট হাউজ জানায়, ট্রাম্প বৃহস্পতিবার এই বোর্ডকে ‘অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেন। এক বিবৃতিতে বলা হয়, বোর্ডের নির্বাহী সদস্যরা গাজার স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবেন। তাদের দায়িত্বের মধ্যে থাকবে প্রশাসনিক সক্ষমতা জোরদার, আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন, বিনিয়োগ টানা এবং বড় পরিসরে অর্থ ও মূলধন সংগ্রহ।
এই পর্ষদে টনি ব্লেয়ার ও মার্কো রুবিও ছাড়াও রয়েছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী মার্ক রোয়ান, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার রবার্ট গ্যাব্রিয়েল। গাজার জন্য বোর্ডের শীর্ষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক জাতিসংঘ দূত নিকোলে ম্লাদেনভ।
এর মধ্যেই তুরস্ক ও মিসরের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় থেকে শনিবার জানানো হয়, গাজা পুনর্গঠন ও শান্তি উদ্যোগে যুক্ত হতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এই শান্তি পর্ষদ ঘোষণার সময়টাও এসেছে চরম উত্তেজনার মধ্যে। গাজায় যুদ্ধবিরতি বারবার ভঙ্গ করে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে, বাড়ছে ফিলিস্তিনি প্রাণহানি। একই সঙ্গে ইসরাইল ধীরে ধীরে গাজার আরও বিস্তৃত এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণ তুলে ধরে শুক্রবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি সেনারা তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ অতিক্রম করে গাজার ভেতরে আরও অগ্রসর হয়েছে। এর আগে বুধবার স্টিভ উইটকফ যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের ঘোষণা দেন।
নতুন এই কমিটি গঠনের বিষয়ে হামাসের শীর্ষ নেতা বাসেম নাইম বলেন, শান্তি পর্ষদ প্রতিষ্ঠা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তার মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, ভবিষ্যতে সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়া ঠেকানো, ভয়াবহ মানবিক সংকট মোকাবিলা এবং পুনর্গঠনের প্রস্তুতির জন্য এই ধরনের কাঠামো প্রয়োজন।
তবে গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ এবং দৈনন্দিন প্রশাসন কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব প্রশ্নে এখনও গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান উপদেষ্টাদের একজন তাহের আল-নুনু আলজাজিরাকে জানান, কায়রোতে চলমান আলোচনায় রাফা সীমান্ত পুনরায় চালু করা, মিসর সীমান্ত দিয়ে ত্রাণের অবাধ প্রবেশ এবং ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিনি বলেন, গাজায় স্বাভাবিকতা ফেরাতে হামাস মধ্যস্থতাকারী ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। তবে তার অভিযোগ, ইসরাইল একের পর এক যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করলেও হামাস মানবিক সহায়তা প্রবেশ ও সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে আলোচনায় সক্রিয় রয়েছে।
এদিকে টনি ব্লেয়ারকে এই পর্ষদে যুক্ত করায় সমালোচনার মাত্রা আরও বেড়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থাকা ব্লেয়ার ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধে ব্রিটেনকে যুক্ত করার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। মধ্যপ্রাচ্যে তার রাজনৈতিক ভূমিকা অনেকের কাছে নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত। মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গাজার শাসন ও পুনর্গঠনের জন্য এ ধরনের বোর্ড গঠন কার্যত একটি ‘ঔপনিবেশিক ধাঁচের’ ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি এখনও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রাজনীতিতে সংবেদনশীল বিষয়। ফলে ব্লেয়ারের মতো একজন নেতাকে গাজার শান্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না।
হোয়াইট হাউজ অবশ্য দাবি করেছে, গাজার স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই বোর্ডের মূল লক্ষ্য। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেখানে একটি ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ (আইএসএফ) মোতায়েনের কথাও বলা হয়েছে, যার নেতৃত্বে থাকবেন সাবেক মার্কিন স্পেশাল অপারেশন কমান্ডার মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফারস।
মন্তব্য করুন

