

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


১৯৯৬ সালের ১০ মে হিমালয়ের ৮,৮৪৯ মিটার উঁচু চূড়া জয় করে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছিলেন ভারত-চীন সীমান্ত পাহারা দেওয়া ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) ল্যান্স নায়েক দর্জে মোরুপ।
তিব্বতের দুর্গম উত্তর ঢাল দিয়ে এভারেস্ট বিজয়ের লক্ষ্য নিয়ে বের হওয়া ছয় সদস্যের ভারতীয় দলের অন্যতম সাহসী সদস্য ছিলেন ৪৮ বছর বয়সী এই পর্বতারোহী।
তবে ঐতিহাসিক সেই আনন্দ উৎসবের রূপ নেওয়ার আগেই নেমে আসে এক ভয়াল তুষারঝড়। চূড়া থেকে নামার পথেই প্রাণ হারান মোরুপ এবং তার দুই সহযোদ্ধা তসেওয়াং স্মানলা ও তসেওয়াং পালজোর।
পর্বতের ৮,৫০০ মিটার উঁচুতে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বরফের নিচে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েন মোরুপ।
তার পায়ের উজ্জ্বল সবুজ জুতার কারণে পর্বতারোহীদের কাছে মরদেহটি পরিচিত হয়ে ওঠে 'গ্রিন বুটস' নামে। দীর্ঘদিন এটিকে পালজোরের দেহ মনে করা হলেও পোশাক, সরঞ্জাম ও রেডিও যোগাযোগের স্থান বিশ্লেষণ করে আইটিবিপি নিশ্চিত হয় যে, এভারেস্টের সবচেয়ে সুপরিচিত এই 'গ্রিন বুটস' আসলে দর্জে মোরুপেরই শেষ স্মৃতিচিহ্ন।
আজ প্রায় ৩০ বছর পর সেই বীর যোদ্ধাকে নিজ ভূমি লাদাখে ফিরিয়ে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার এক অভাবনীয় ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা করছে ভারত।
হিমালয়ের ৮,০০০ মিটারের ওপরের অঞ্চলকে বলা হয় 'ডেথ জোন', যেখানে বাতাসের চাপ ও অক্সিজেনের পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে।
তিব্বতের খাড়া ও পাথুরে উত্তর ঢাল থেকে মরদেহ নামিয়ে আনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, কারণ সেখানে নেপালের মতো হেলিকপ্টার সহায়তার কোনো সুযোগ নেই। বরফে জমে থাকা সরঞ্জামের কারণে মরদেহের ওজন কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় সহায়তাকারী দড়ি টাঙাতেই প্রয়োজন ১০-১২ জন দক্ষ শেরপার।
একটি মরদেহের জন্য যেন কোনো জীবিত শেরপার জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে, সেই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে আইটিবিপি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বিশেষজ্ঞ পর্বত উদ্ধারকারী দল খুঁজছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে মরদেহটি নামিয়ে এনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার পর তা পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে মোরুপের পরিবার ও তার ৭৫ বছর বয়সী স্ত্রী কনচাক ইয়াংস্কিট এক অবর্ণনীয় অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।
কোনো দিন শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা কিংবা মরদেহ না দেখার কারণে ইয়াংস্কিটের মন কখনো বিশ্বাস করতেই চায়নি যে তার স্বামী আর বেঁচে নেই; আজও রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তার মনে হয় মোরুপ হয়তো দরজায় কড়া নাড়বেন।
লাদাখের বাড়িতে আজ মোরুপের স্মৃতি বলতে রয়েছে কয়েকটি পুরোনো ছবি, কিছু পদক এবং চীন সরকারের দেওয়া এভারেস্ট জয়ের একটি ঐতিহাসিক সনদ। মোরুপের ছেলে পাঞ্চোক দর্জাই জানান, বাবার মরদেহ ফিরে পেলে লেহের মার্টিয়ার্স পার্কের কাছে দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া একজন শহীদের পূর্ণ মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে।
দীর্ঘ ৩০ বছরের এই বেদনাময় অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাবাকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি, তার স্মৃতি ও সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে ঐতিহাসিক সেই 'গ্রিন বুটস' জুজোটি এভারেস্ট জয়ের সনদের পাশে সযত্নে সাজিয়ে রাখতে চায় তার পরিবার।