রবিবার
৩১ মে ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
৩১ মে ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডিম নিক্ষেপ, মারধর

বিবিসি বাংলা
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৬, ০৮:১৮ এএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের সদ্য প্রাক্তন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে শনিবার শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়েছে। তার জামা ছিঁড়ে দেওয়া হয়, ছোড়া হয় ডিম আর কাদা। তার উদ্দেশ্যে 'চোর চোর' স্লোগানও দেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ ২৪ পরগণার সোনারপুরে এক নিহত কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই বাড়িতে পৌঁছানোর আগে থেকেই তাকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখান বহু মানুষ।

এক পর্যায়ে তাকে ঘিরে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে মানুষের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ওই ঘটনার ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দিয়েই অভিষেক একটি মোটরসাইকেলে চেপে এগোনোর চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে বহু মানুষ তাকে শারীরিকভাবে হেনস্থা করছেন। নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে ঘিরে রেখেছেন। বহু মানুষ তার উদ্দেশ্যে 'চোর চোর' বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন। এরমধ্যে একজন কেউ তার মাথায় একটা নীল হেলমেট পরিয়ে দিচ্ছেন। এ সময়ই তার দিকে ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ ডিম ছুড়ে মারে।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেখুন আপনারাই দেখুন। আমার কী হাল করেছে। এটাই এদের গণতন্ত্রের নমুনা। হেলমেট ছিল বলে আমার মাথাটা বেঁচে গেছে। আমার চশমা ভেঙে দিয়েছে, জামা ছিঁড়ে দিয়েছে, কী অবস্থা করেছে দেখুন।

তিনি বলেন, ‘কী অবস্থা করেছে দেখেছেন? পুলিশকে আগেই জানানো হয়েছিল বহিরাগতরা জড়ো হয়েছে।’

পরে অভিষেককে ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরা। তাকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়েও উপস্থিত মানুষ তাকে উদ্দেশ্য করে বিক্ষোভ দেখান।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অসুস্থ বোধ করায় তাকে কলকাতার একটা বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেসের অনেক নেতানেত্রী হাসপাতালে পৌঁছিয়েছেন। তবে রাতে সেই হাসপাতাল থেকে তাকে সরিয়ে শহরের অন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে যান মমতা।

ঘটনার নিন্দা করেছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, ‘শাসকই এখন ঘাতক।’

বিজেপি বলেছে, এই ঘটনার সঙ্গে তাদের দলের কোনো যোগ নেই।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের বলেন, ‘এর সঙ্গে বিজেপির কোনো সম্পর্ক নেই। এটা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ। আমরা সংযত আছি বলেই তৃণমূল রয়েছে। আজ যদি তৃণমূল ক্ষমতায় ফেরত আসত, তাহলে আমরা কথা বলার অবস্থায় থাকতাম না। আর কংগ্রেস বা সিপিআইএম ক্ষমতায় এলে যিনি এত কথা বলছেন তিনি কিছু বলার মতো অবস্থায় থাকতে পারতেন না।’

'ওরা আমায় মারতে চায়'

পশ্চিমবঙ্গে সদ্য রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। ভোটে ভরাডুবির পর দলের অন্দরে অনেকেই আইপ্যাক এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে 'দায়ী' করেছেন। যে সমস্ত তৃণমূল কর্মীরা ভোটের পর আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ, তাদের পাশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কাউকেই দেখা যায়নি। সেই নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে দলের কর্মীর অনেকে।

শেষমেশ শনিবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তার দলের দুই নিহত কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান।

সকালবেলা তিনি গিয়েছিলেন দলের মুখপাত্র ও কলকাতার বেলেঘাটার অঞ্চলের বিধায়ক কুণাল ঘোষের বাড়ি। সেখানে তৃণমূলের এক নিহত কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। বিকেলে তিনি যখন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে নিহত তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে বিক্ষোভের মুখে পড়েন।

নিহত কর্মীর বাড়ি মূল রাস্তা থেকে বেশ কিছুটা দূরে। মোটরবাইকে সওয়ার হয়ে যাওয়ার সময় তাকে কালো পতাকা দেখানো হয়, 'চোর চোর' স্লোগান দেওয়া হয়। হঠাৎ বিক্ষোভকারীদের একাংশ তাকে লক্ষ্য করে ডিম, কাদা ছুঁড়তে থাকে। কেউ আবার তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, কেউ আরজি কর হাসপাতালে নিহত চিকিৎসকের বিচার চান।

ক্রমে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরই মাঝে অভিষেকের সঙ্গে উপস্থিতদের মধ্যে থেকে কেউ তাকে একটা হেলমেট দেন। কিন্তু তারপরেও হেলমেট খোলার চেষ্টা করা হয়, শারীরিক হেনস্থা করা হয়। তার জামাও ছিঁড়ে যায়। কোনোক্রমে নিহত কর্মীর বাড়িতে ঢোকেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে বিচারের আশ্বাসও দেন।

অন্যদিকে, বাড়ির বাইরে উপস্থিত ছিলেন বিক্ষোভকারীদের অনেকেই। কেউ ভোটের আগে তার বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে প্রশ্ন করতে থাকেন কেউ ওই এলাকায় প্রয়োজনীয় পরিষেবা না পাওয়ার বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

সাংবাদিকদের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘দেখেছেন কী করছে? ওরা আমায় মারতে চায়, মেরে দিক। আমি এখান থেকে যাব না। সঞ্জুর বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। আমি হয়তো এই ভাবে এখান থেকে বেরিয়ে গেলাম। তার পর তো সঞ্জু কর্মকারের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের উপর চড়াও হবে ওই বখাটেগুলো।’

তিনি বলেন, ‘ওরা (নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়ির) দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। পুলিশের কেউ নেই এখানে। আমি এসপি এবং আইসি-কে জানাতে বলেছি। আমার কাছে সব রেকর্ড আছে। কোনো পুলিশ আসেনি।’

পরে তাকে উদ্ধার করার জন্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যদের একটা দল পাঠানো হয়।

বিক্ষোভকারীদের কটূক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘যারা তৃণমূলকে চোর বলছে, তারা পশ্চিমবঙ্গের কোনো মুখ্যমন্ত্রীকে হাত বার করে ক্যামেরার সামনে টাকা নিতে দেখেছেন?’

এরপর তিনি 'নারদা' কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য প্রথম থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।

'উনিও বুঝতে পারছেন ক্ষোভটা মানুষের মধ্যে কোন লেভেলে পৌঁছেছে'

শনিবারের ঘটনার নিন্দা করলেও এর সঙ্গে যে বিজেপির কোনো যোগ নেই, তা প্রথম থেকেই দাবি করেছেন দলের নেতারা। বিজেপির সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘বিজেপি কোনো রাজনৈতিক নেতার ওপর আক্রমণ, আইন হাতে তুলে নেওয়াকে সমর্থন করে না।’

তিনি বলেন,‘মানুষের মধ্যে বিরাট ক্ষোভ-বিক্ষোভ আছে। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এতদিন বার হননি। উনি ভেবেছিলেন ২৬ দিন পর বার হলে মানুষের ক্ষোভ বিক্ষোভ কমে যাবে। কিন্তু উনিও বুঝতে পারছেন ক্ষোভটা মানুষের মধ্যে কোন লেভেলে পৌঁছেছে।’

এই ঘটনার জন্য তৃণমূলকেই দায়ী করেছেন শমীক ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন একাধিপত্য চলতে পারে না। মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশে এমন ঘটনা কাম্য নয়। এর সঙ্গে আমার দলের দূর দূর পর্যন্ত কোনো সম্পর্ক নেই। তৃণমূল আমাদের কর্মীদের সঙ্গে যে অত্যাচার করেছে, আমরা সংযত ছিলাম বলেই আজ তৃণমূল অক্ষত আছে।’

ঘটনার নিন্দা করেছে কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের একজন প্রধান নেতা শ্রী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জির ওপর নৃশংস হামলা চালিয়ে বাংলার নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী বিজেপি সরকার প্রমাণ করেছে যে বিজেপি ঘৃণা, নেতিবাচক, হিংসাত্মক রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। এমন একটি সংবেদনশীল পরিস্থিতিতেও পুলিশি ব্যবস্থার অভাব বড় ষড়যন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করছে। চরম নিন্দনীয়।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন