বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এতিম সেই শিশুর ভাইরাল চিঠির নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর ঘটনা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
সেই চিঠি ও শিক্ষার্থী-ফাইল ছবি
expand
সেই চিঠি ও শিক্ষার্থী-ফাইল ছবি

‘ইফতারি বুট-মুড়ি দেয় রাইতে বাত দেয়না, সেহরিতে দেয়। আমার লাইগা কিছু খাওন আইনো, ভালো খাওন’— একটি চিঠি, একটি গল্প। আর তাতে হাজারো মানুষের আবেগের বিস্ফোরণ। এতিম শিশুর কষ্টের বর্ণনা মুহূর্তেই ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়।

চিঠিটা পড়ে আপনি হয়তো কেঁদেছেন, শেয়ারও করেছেন সহানুভূতি জানিয়ে। কিন্তু যদি বলি এই গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে ভিন্ন এক বাস্তবতা? এক এতিম শিশুর কষ্টের গল্প নাকি পরিকল্পিত আবেগের ফাঁদ? সত্যটা আসলে কি?

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল চিঠিটি মায়ের উদ্দেশ্যে লেখেন শিশু তাহসিন আব্দুল্লাহ। বর্তমান সে লেখাপড়া করছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর তা'মীরুল মিল্লাত এতিমখানার ষষ্ঠ শ্রেণিতে, মূলত মাদ্রাসাটি তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা ট্রাস্টের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান।

রোববার (১৫ মার্চ) সরেজমিনে যাওয়ার পর মাদ্রাসাটির ভেতরে সাক্ষাত পাই সুপারিন্টেন্ডেন্টসহ কয়েকজন শিক্ষককের। তবে আমরা শুরুতে কথা বলতে চাই সেই শিশুটির সঙ্গে। তবে অন্যান্য শিশুরা জানালো তাহসিনকে ১৫ মার্চ সকালে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যায় তার মা। শিশুটির মা নাসরিন আকতারের ফোন নম্বর সংগ্রহ করা হয়। পরে কল দিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে।

তিনি ও তার ছেলের সাক্ষাৎকার নিতে চাইলে নাসরিন আকতার বলেন, ‘আজ ইন্টারভিউ দেওয়ার টাইম নাই, আজ একটু ব্যস্ত থাকবো। আগামীকাল আপনি কল দেন, তবে হ্যোয়াটসঅ্যাপে কল দিবেন, অফলাইনে কল দিবেন না।'

তার কথা মতো পরেরদিন আবারো সকাল ১০টার পর কল দেয়া হয়। প্রথমে দেয়া হয় হ্যোয়াটসঅ্যাপে কল, সাড়া না পাওয়া গেলে অফলাইনে কল দেওয়া হয় তাকে। কিন্তু কয়েকবার কল বাজলেও রিসিভ করেননি নাসরিন আকতার।

এতো হৃদয়বিদারক একটি ঘটনার অবতারণা করে হঠাৎ ফোন রিসিভ না করার কারণ কী? বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে থাকে আমাদের। আবারো একদিন অপেক্ষা করে কল দেওয়া হয় তাকে। এবার নম্বরটি সরাসরি বন্ধ পাওয়া যায়।

কোনো ভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব না হলে সোশ্যাল মিডিয়ায় নাসরিন আকতারের আইডি লিংক খোঁজার চেষ্টা চালাই আমরা। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তার আইডির লিংক পাওয়া গেলেও, ততক্ষণে আইডিটি ডিএকটিভ করে দেন চতুর নাসরিন আকতার।

এবার চলুন আবারো ফিরে যাই সেই মাদ্রাসায়। প্রথমে কথা বলতে চাই মাদ্রাসাটির সুপারিন্টেন্ডেন্ট মাওলানা মো. ফছিহুর রহমানের সঙ্গে। তার কাছে প্রশ্ন ছিলো কেন তারা ভালো খাবার কিংবা ভালো জামা কাপড় দেয়নি শিশুদের?

উত্তরে তিনি বলেন, শিশু বক্তব্যটা আমার কাছেও সামান্যতম সত্য তো নয়ই বরং উল্টাপাল্টা মনে হয়েছে। আমাদের মাদ্রাসায় বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীরা খাবার দেয়, নিজেরাও রান্না করি। তবে রমজান মাসে ইফতার ও সেহরিতে সবসময় ভারি খাবার খাওয়ানো হয়। এতো ভালো খাবার আসার পরও কেন তাদের কম খাওয়াবো?

তিনি বলেন, প্রতি মাসেই চাকা সাবান ও তিব্বত সাবান দেয়া হয়। আর বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমাদের শিশুদের ঈদে নতুন জামাকাপড় দেয় এবারও সবাই পেয়ে গেছে এবং সেই শিশুটিও পেয়েছে।

মাওলানা ফছিহুর রহমান জানান, ১৫ মার্চ সকালে মাদ্রাসায় আসেন শিশুটির মা নাসরিন আকতার। সে সময় নাসরিন জানান, মানুষের সিম্প্যাথি পাওয়ার আশায় বিভিন্ন সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেন তিনি, এতে করে মানুষ তাকে কিছু অর্থকরী দেন। সেগুলো দিয়ে ছেলেদের লেখাপড়ার খরচ ও বাড়িভাড়া দিয়ে থাকেন। আর বাকি টাকা অন্যান্য খাতে খরচ করেন তিনি।

প্রধান শিক্ষকের কথার সত্যতা যাচাই করতে চাই আমরা। মাদ্রাসা ভবনের ৩য় তলায় থাকতো শিশু তাহসিন। তার পাশেই থাকে তার সহপাঠী ওমর ফারুক ও মাহদী হাসান। ভাইরাল হওয়া চিঠির সত্যতা জানতে তাদের সাথে কথা বলি।

শিশুদের টাংকে তল্লাসি চালিয়ে সাবান ও নতুন জামাকাপড় পাই আমরা। ফারুক ও মাহদী জানান, কখনো খাবার দাবাড়ে কষ্ট পায়নি তারা। কোনো কিছুর অভাব নাই তাদের।

অর্থাৎ কোনো ধরনের বিড়ম্বনা ছাড়াই মাদ্রাসায় লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছেন তারা। তারমানে শিক্ষক ও ছাত্রদের কথার মিল পাওয়া গেলো।

মাদ্রাসার পাশেই ব্যবসা করেন এমন দুইজনের সাথে কথা হয়। তাদের একজন সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, ১১ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করি কোনোদিন শুনিনি এখানে কোনো ছাত্র কষ্টে আছে। বরং রমজান মাস এলে এতো এতো খাবার আসে, ছাত্ররা খেয়েও শেষ করতে পারেনা।

আর আরেক ব্যবসায়ী আবু শরিফ জানান, ২৪ বছর ব্যবসা করি এখানে। আজ পর্যন্ত কোনো ছাত্রের সাথে এমন কিছু হয়নি যে, তারা খাবার বা কাপড় ছোপর পায়নি। তিনিও কখনো শুনেননি মাদ্রাসা কখনো ছাত্রদের কষ্ট দেয়। এখানে যা হয় আর কোনো এতিমখানায়ই তা হয় না। অর্থাৎ সুন্দরভাবেই পরিচালনা করা হয়।

এবার আমরা বাস্তবেও এর মিল খুঁজতে চাই। সত্যিই কি ইফতারে শুধু বুট মুড়ি দেয় নাকি অন্য কিছু! ১৫ মার্চ ইফতারের আইটেমে দেখা যায় প্রায় ৮ থেকে ১০ রকমের খাবার রয়েছে ইফতারে। কয়েকরকমের ফল ও মোরগ পোলাও।

তাহলে সন্তানের এমন অসহায়ত্বের চিঠি নাসরিন আকতার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার কারণ কী? সত্যিই কী তার সন্তানের ভালো খাবার আর শুধু জামা কাপড় পাওয়ার আশায় এমন পোস্ট দিয়েছেন? নাকি ভিন্ন উদ্দেশে এটি করেছেন তিনি। অনুসন্ধানে এবার বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর এক কথোপকথন।

কথোপকথনে নাসরিন আকতার নিজেই স্বীকার করেছেন যে, সন্তানদের কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের সহানুভূতি আদায় করে অর্থ সংগ্রহ করেন তিনি। আর সেই অর্থ দিয়েই চালান বাড়িভাড়া ও অন্যান্য খরচ।

সোশ্যাল মিডিয়ার আবেগ, কখনো কখনো হয়ে উঠতে পারে প্রতারণার হাতিয়ারও। তাই সহানুভূতি দেখানোর আগে সত্য যাচাই করাই সবচেয়ে জরুরি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Curaçao VS Ivory Coast
Scheduled
26 Jun, 02:00 AM
VS
World Cup