


মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন হলো রিযিক। ইসলাম শুধু ইবাদত-বন্দেগীর ধর্ম নয়; বরং জীবন পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে পবিত্রতা, ন্যায়, সততা ও বৈধতার শিক্ষা দেয়। তাই ইসলামে “কী উপার্জন করছি” — এর পাশাপাশি “কীভাবে উপার্জন করছি” সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষের নামাজ, রোযা, হজ্জ, দান-সদকা—সব ইবাদতের ভিত্তি হলো হালাল উপার্জন। হারাম খাদ্য ও হারাম সম্পদ মানুষের আত্মাকে কলুষিত করে, হৃদয়কে কঠিন করে এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
হালাল রিযিক: ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত আল্লাহ তা'আলা বলেন: “হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে তা থেকে আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।” [সূরা আল-বাকারাহ: ১৬৮]
আরও বলেন: “হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে পবিত্র রিযিক দিয়েছি তা থেকে আহার কর।” [সূরা আল-বাকারাহ: ১৭২]
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, শুধু খাবার পেলেই হবে না; তা হতে হবে হালাল, পবিত্র ও ন্যায়সঙ্গত উপায়ে অর্জিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কিছুই গ্রহণ করেন না।” ( সহীহ মুসলিম)
অর্থাৎ, হারাম সম্পদ দিয়ে দান করলেও তা কবুল হয় না; হারাম খাদ্যে লালিত শরীরের ইবাদতও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
হারাম উপার্জনের কিছু প্রচলিত রূপ: আজকের সমাজে অনেকেই অজান্তে বা সচেতনভাবেই বিভিন্ন ধরনের হারাম উপার্জনের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। যেমন:
১. সুদ (রিবা): সুদ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ভয়াবহ গুনাহ। আল্লাহ তা'আলা বলেন: “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৫]
আরও ভয়াবহ সতর্কবাণী এসেছে— “যদি তোমরা সুদ ত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৯]
২. ঘুষ: ঘুষ সমাজে ন্যায়বিচার ধ্বংস করে এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করে।
রাসূল ﷺ বলেছেন: “ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহণকারী উভয়ের উপর আল্লাহর লানত।” ( সুনান আবু দাউদ)
৩. ভেজাল ও প্রতারণামূলক ব্যবসা: ওজনে কম দেওয়া, পণ্যের ত্রুটি গোপন করা, ভেজাল মেশানো—এসব মারাত্মক গুনাহ। আল্লাহ বলেন: “ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়।” [সূরা আল-মুতাফফিফীন: ১]
রাসূল ﷺ বলেছেন: “যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহীহ মুসলিম)
৪. মিথ্যা ও জালিয়াতির মাধ্যমে আয়: মিথ্যা সাক্ষ্য, জাল কাগজপত্র, ভুয়া হিসাব, কর ফাঁকি, দুর্নীতি—সবই হারাম।
৫. পেশাগত দায়িত্বে কারচুপি: অফিসে দায়িত্বে অবহেলা, সময় নষ্ট করা, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, জনগণের হক নষ্ট করা—এসবও হারাম উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।
৬. অনৈতিক ও নিষিদ্ধ ব্যবসা: মাদক, জুয়া, অশ্লীলতা, মানবপাচার, চুরি, ডাকাতি বা মানুষের ক্ষতিকর পণ্য দ্বারা উপার্জন ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
হারাম খাদ্য ও উপার্জনের ভয়াবহ প্রভাব: ১. দো‘আ কবুল হয় না রাসূলুল্লাহ ﷺ এক ব্যক্তির উদাহরণ দেন— সে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত, এলোমেলো অবস্থায় হাত তুলে আল্লাহকে ডাকছে। কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা লালিত। তখন রাসূল ﷺ বলেন: “তার দো‘আ কীভাবে কবুল হবে?” (সহীহ মুসলিম)
এটি অত্যন্ত ভয়াবহ সতর্কতা। একজন মানুষ রাতভর তাহাজ্জুদ পড়তে পারে, অশ্রু ঝরাতে পারে—কিন্তু হারাম রিযিক তার দো‘আর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২. ইবাদতের নূর ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়: হারাম খাদ্য মানুষের হৃদয়কে অন্ধকার করে দেয়। নামাজে মন বসে না, কুরআনের তিলাওয়াতে প্রশান্তি আসে না, দুনিয়ার প্রতি আসক্তি বেড়ে যায়। অনেক সময় মানুষ বাহ্যিকভাবে ধার্মিক হলেও অন্তরে শান্তি অনুভব করে না—এর একটি বড় কারণ হতে পারে হারাম উপার্জন।
৩. পরিবার ও সন্তানের উপর খারাপ প্রভাব পড়ে: হারাম খাদ্যে বেড়ে ওঠা সন্তানদের চরিত্র, নৈতিকতা ও আখলাকের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিবার থেকে বরকত উঠে যায়, অশান্তি বৃদ্ধি পায়।
৪. সম্পদের বরকত ধ্বংস হয়ে যায়: হারাম সম্পদ বাহ্যিকভাবে অনেক মনে হলেও তাতে প্রকৃত কল্যাণ থাকে না। অসংখ্য মানুষ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও মানসিক শান্তি, পারিবারিক সুখ বা নিরাপত্তা পায় না। কারণ হারাম সম্পদ মানুষের জীবনে রহমতের পরিবর্তে অশান্তি নিয়ে আসে।
৫. পরকালে কঠিন শাস্তি: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে শরীর হারাম দ্বারা পুষ্ট হয়েছে, জাহান্নাম তার জন্য অধিক উপযুক্ত।” (তিরমিযী)
আরেক হাদীসে এসেছে— “হারাম উপার্জনে বৃদ্ধি পাওয়া গোশতের জন্য জান্নাত উপযুক্ত নয়।” (মুসনাদ আহমাদ)
অর্থাৎ হারাম শুধু দুনিয়াকে ধ্বংস করে না; আখিরাতকেও ভয়াবহ বিপদের মুখে ফেলে দেয়।
তওবা ও ফিরে আসার পথ ইসলাম হতাশার ধর্ম নয়। কেউ ভুল করলেও তার জন্য তওবার দরজা খোলা।
করণীয়:
আল্লাহ তা'আলা বলেন: “যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।” [সূরা আত-তালাক: ২-৩]
হালাল রিযিকের ফযীলত হালাল উপার্জন কম হলেও তাতে প্রশান্তি ও বরকত থাকে। রাসূল ﷺ বলেছেন: “সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সাথে থাকবে।” (তিরমিযী)
একজন শ্রমিকের ঘাম, একজন সৎ ব্যবসায়ীর আয়, একজন নিষ্ঠাবান কর্মচারীর বেতন—যদি তা হালাল হয়, তবে সেটিই ইবাদত।
হারাম উপার্জন শুধু একটি আর্থিক অপরাধ নয়; এটি আত্মার রোগ, ইবাদতের প্রতিবন্ধক এবং আখিরাত ধ্বংসের কারণ।
আজ সমাজে দুর্নীতি, প্রতারণা, সুদ, ঘুষ ও অনৈতিকতার বিস্তার আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।
তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত— নিজের উপার্জনের উৎস যাচাই করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা, এবং নিজের পরিবারকে হালাল রিযিকের উপর গড়ে তোলা।
“হালাল অল্প হলেও তা বরকতময়; আর হারাম বেশি হলেও তা ধ্বংসের কারণ"।
মীর সাদী, সাংবাদিক