

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ইসলাম মানবতার ধর্ম। মানব চরিত্র গঠন ও উন্নয়নই এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকে সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে পাঠানো হয়েছে মানব চরিত্রের পূর্ণতা প্রতিষ্ঠার জন্য।
তিনি বলেছেন, “আমাকে পাঠানো হয়েছে উত্তম চরিত্রকে পরিপূর্ণ করতে।” (মুসলিম, তিরমিজি)। আর কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সম্বোধন করে বলেছেন, “নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।” (সূরা কলম, আয়াত: ৪)।
মানব চরিত্রের উৎকৃষ্ট গুণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা। কোরআনে আল্লাহ নিজেকে ধৈর্যশীল ও সহনশীল হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। ধৈর্যকে বলা হয় সবর এবং সহিষ্ণুতাকে বলা হয় হিলম।
এ দুটি শব্দ কাছাকাছি অর্থ প্রকাশ করলেও পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত সবর মানে হলো অক্ষমতার কারণে প্রতিরোধ না করা, আর হিলম মানে হলো শক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ গ্রহণ না করা। এ দিক থেকে হিলমকে সবরের তুলনায় উচ্চতর মান ধরা হয়। তবে কখনো কখনো এ দুটি শব্দ একই অর্থে ব্যবহৃত হয়।
কোরআনে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা বিষয়ে অনেক আয়াত রয়েছে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সহিষ্ণু।” (সূরা হজ: ৫৯)। অন্যত্র বলেছেন, “আমি তাঁকে (আইয়ুব আ.) পেলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা তিনি! তিনি ছিলেন আল্লাহর দিকে ফিরে আসা বান্দা।” (সূরা সাদ: ৪৪)। আবার কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, “নিশ্চয় এতে নিদর্শন আছে প্রত্যেক ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ মানুষের জন্য।” (সূরা ইবরাহিম: ৫)।
ধৈর্যের গুরুত্ব বোঝাতে আল্লাহ তাআলা সূরা আসরে শপথ করে বলেছেন, “মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত, তবে তারা নয় যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে, সত্যকে উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।” (সূরা আসর: ১-৩)। আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ! ধৈর্য ধরো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো—তাহলেই তোমরা সফল হবে।” (সূরা আলে ইমরান: ২০০)।
এছাড়া সূরা বাকারা (আয়াত: ১৫৩)-এ বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”
কোরআনে জীবনের উদ্দেশ্য নিয়েও বলা হয়েছে যে, জীবন ও মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করা হয়—কে কর্মে উত্তম তা যাচাই করার জন্য (সূরা মুলক: ১-২)। আবার বিপদে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য বিশেষ সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, “আমি অবশ্যই ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ ও জীবনের ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। আর সুসংবাদ দাও তাদের, যারা বিপদের সময় বলে, ‘আমরা তো আল্লাহরই এবং আমরা তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তনকারী।’” (সূরা বাকারা: ১৫৫-১৫৭)।
হাদিস শরিফেও ধৈর্যের গুরুত্ব বারবার এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি বিপদের সময় ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়ে, আল্লাহ তার ক্ষতির পরিবর্তে উত্তম কিছু প্রদান করবেন।” (বুখারি ও মুসলিম)। নবী আইয়ুব (আ.)-এর জীবনে আমরা চরম ধৈর্যের উদাহরণ দেখতে পাই।
তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর কষ্ট সহ্য করেছিলেন, অথচ অধৈর্য হননি। বিপরীতে নবী ইউনুস (আ.) সামান্য অধৈর্য হওয়ার কারণে মাছের পেটে বন্দী হয়েছিলেন (সূরা কলম: ৪৮)।
তাফসিরকারগণ ধৈর্যকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন: ১. ছবর আনিল মাছিয়াত — পাপ থেকে বিরত থাকা। ২. ছবর আলাত তাআত — ইবাদতে দৃঢ় থাকা। ৩. ছবর আলাল মুসিবাত — বিপদে অস্থির না হওয়া।
কোরআনে সাহস ও ধৈর্যের চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায়। হজরত মুসা (আ.) সমুদ্রপাড়ে এসে উম্মতকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “আমার সঙ্গে আছেন আমার প্রতিপালক, তিনি অবশ্যই আমাকে পথ দেখাবেন।” (সূরা শু‘আরা: ৬২)।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন হিজরতের সময় গারে সুরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন সাহাবি আবু বকর (রা.)-কে আশ্বস্ত করেছিলেন এই বলে: “দুঃখ করো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গেই আছেন।” (সূরা তাওবা: ৪০)।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ধৈর্য শুধু বিপদে সহ্যশক্তির নাম নয়। ধৈর্যের মধ্যে রয়েছে পাপ থেকে বিরত থাকা, ইবাদতে দৃঢ় থাকা এবং প্রতিকূলতায় স্থির থাকা—এই তিনের সমন্বয়ই হলো প্রকৃত ধৈর্য।
যে ব্যক্তি এভাবে ধৈর্য অবলম্বন করে, তার জীবনে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই নেমে আসে। কারণ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন, আর আল্লাহ যার সঙ্গে থাকেন, তার সফলতা অনিবার্য।
মন্তব্য করুন
