

পবিত্র আল-কুরআন–এ ইরান নামটি সরাসরি নেই। তবে পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ আছে সূরা আর-রূম।
ইসা (আ.) জন্মের ৫০০ থেকে ৬০০ বছর আগে পারসিকরা তাদের প্রভু অসিরীয়দের সরিয়ে নিনেভ দখল করে নেয়। তারা ছিল আর্য। বিরাট এক সাম্রাজ্য স্থাপন করে তারা। তাদের বিখ্যাত রাজাদের নাম ছিল কাইরাস, দারিয়ুস ও জেরোকসিস। ইতিহাস তাদের চেনে একিমেনিড রাজবংশ নামে। এরপর ইরানের ইতিহাস বদলেছে। বদলেছে শাসক ও শাসনব্যবস্থা।
সূরা আর-রূমের শুরুতে বলা হয়েছে, রোমানরা (বাইজেন্টাইন) পারস্যদের কাছে পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আবার বিজয়ী হবে। তৎকালীন পারস্য ছিল আজকের ইরান অঞ্চলের শক্তিশালী সাম্রাজ্য। এই আয়াতগুলো মুসলিমদের কাছে একটি ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে বিবেচিত, যা পরে ইতিহাসে সত্য হয়।
মুহাম্মদ (সা.)–এর বিভিন্ন হাদিসে পারস্যের মানুষদের ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সহিহ হাদিসে এসেছে, নবী (সা.) একবার সালমান আল-ফারসিকে (পারস্যের সাহাবি) ইঙ্গিত করে বলেন, যদি ঈমান আকাশের নক্ষত্রেও ঝুলে থাকে, পারস্যের লোকদের মধ্য থেকে কেউ তা অর্জন করবে। (এই বর্ণনা পাওয়া যায় সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম–সহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে।)
এ থেকে অনেক আলেম ব্যাখ্যা করেন যে, জ্ঞান, গবেষণা ও ইসলামী বিদ্যায় পারস্য অঞ্চলের মানুষের বড় অবদান থাকবে। ইতিহাসে ইমাম গাজ্জালি, ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিমসহ বহু মহান ইসলামি পণ্ডিত ওই অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন।
১৯৩৫ সাল অব্দি ইরানকে পারস্য নামে জানত লোকেরা। বর্তমান ইরানের থেকেও অনেক বিস্তৃত ছিল প্রাচীন পারস্য। তারা খ্রিষ্টপূর্ব কয়েক শতাব্দী ধরে প্রাচীন গ্রিসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেও তাদের সংগ্রাম ও আপসহীনতা ছিল যুদ্ধংদেহী। তারা নিয়ন্ত্রণ করত মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তখনও মদিনায় যাননি, মক্কায় অবস্থান করছেন। সেসময় রোমানরা পারসিকদের (বর্তমান ইরান) কাছে লাগাতার যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছিল। ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে দামেস্ক পর হয়ে জেরুজালেম পর্যন্ত দখল করে নেয় পারসিকরা। এতে মক্কার মুসলমানদের মন ভাঙে। খুশি হয়ে কাফেররা। কারণ, পারসিকরা ছিল মক্কার কাফেরদের মতো পৌত্তলিক। রোমানরা ছিল মুসলমানদের মতো নবী, আসমানি কিতাব ইত্যাদিতে বিশ্বাসী।
এ সময় কোরআনে আয়াত নাজিল হয় যে, কয়েক বছরের মধ্যেই রোমানরা বিজয়ী হবে। আল্লাহ বলেন, ‘রোমানরা পরাজিত হয়েছে নিকটবর্তী এলাকায় এবং তারা তাদের পরাজয়ের পর শিগগিরই জয়লাভ করবে, কয়েক বছরের মধ্যেই। আগের ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। আর সেদিন মোমিনরা আনন্দিত হবে।’ (সুরা রুম : ২-৪)।
কোরআনের এ ভবিষ্যদ্বাণী শুনে মক্কার মুসলিমরা বেজায় খুশি হন। ‘অচিরেই রোমানরা বিজয়ী হবে’ মক্কার চারপাশে এ ঘোষণা দেন আবু বকর (রা.)। কাফেররা ঠাট্টা করল। উবাই ইবনে খলফ তাকে মিথ্যাবাদী বলল। আবু বকর বললেন, ‘রোমানরা তিন বছরের মধ্যে বিজয়ী হতে না পারলে তোমাকে দশটি উট দেব।’ উবাই রাজি হলো। জুয়া তখনও হারাম হয়নি ইসলামে।
আবু বকর (রা.) ছুটে এলেন মহানবী (সা.)-এর কাছে। তিনি ঘটনা শোনালেন। মহানবী (সা.) বললেন, ‘আমি তিন বছর নির্দিষ্ট করেনি। তিন থেকে ৯ বছরের মধ্যে হতে পারে। তুমি উবাইকে বলো, দশটি উটের পরিবর্তে ১০০ উট দেবে। তবে সময়কাল তিন থেকে ৯ বছর।’ আবু বকর (রা.) তাই করলেন। উবাইও রাজি হলেন।
হিজরতের পাঁচ বছর আগে এ ঘটনা ঘটে। সাত বছরে পূর্ণ হওয়ার পর বদর যুদ্ধের সময় রোমাকরা পারসিকদের পরাজিত করে। বিজয়ের মুকুট চলে আসে রোমকদের মাথায়। ৬২৪ সালে রোমানরা ইরানিদের সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ড ভেঙে ফেলে। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, ১০৩৭)।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে একে অপরের উপর। এই সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক ও বেসামরিক খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরানও। প্রায় প্রতিদিনই চলছে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাত বড় পরিসরে গড়ালে তা রূপ নিতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের—এমনকি অনেকে এটিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন।
তবে ইসলামি বিশ্বের একটি অংশ এমন পরিস্থিতিকে কেয়ামতের পূর্ব লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করছেন। কারণ, বহু শতাব্দী আগেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ।
একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘খোরাসান থেকে একদল সৈন্য কালো পতাকা নিয়ে আগমন করবে। কেউ তাদের থামাতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা বায়তুল মুকাদ্দাসে সে পতাকা উড়ায়।’
এই হাদিসটি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা চলেছে ইসলামি জগতে। ইতিহাসবিদদের মতে, খোরাসান বলতে বোঝানো হয়েছে একটি বিস্তৃত অঞ্চলকে—যার মধ্যে বর্তমান ইরান, আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের কিছু অংশ রয়েছে। এর অধিকাংশ এলাকাই আজকের ইরানের ভেতরেই পড়েছে।
হাদিসটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই কালো পতাকাধারী বাহিনী আল আকসা মসজিদ তথা বায়তুল মুকাদ্দাসে পতাকা উত্তোলন করবে। অর্থাৎ, তার আগ পর্যন্ত পবিত্র মসজিদটির নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাতে থাকবে না।
১৯৮০ সালে ইসরায়েল একটি আইন পাশ করে জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী ঘোষণা করে। যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে, বাস্তবে এখনো জেরুজালেম এবং আল আকসা মসজিদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ইসরায়েলের দখলে।
অপর একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন তোমরা খোরাসান থেকে কালো পতাকা দেখতে পাবে, তখন তাদের কাছে চলে যেও। কারণ, তাদের মধ্যেই আছেন আল্লাহর খলিফা—ইমাম মাহাদী।’
এই হাদিসদ্বয়ের সমন্বয়ে বহু ইসলামি আলেম বিশ্বাস করেন, খোরাসান থেকে আগত সেই কালো পতাকার বাহিনীর নেতৃত্বে থাকবেন ইমাম মাহাদী, এবং তারা বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয় করবেন। এটি কেয়ামতের পূর্বের অন্যতম বড় আলামত বলে মনে করা হয়।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরেকটি বিষয় উঠে আসে—তা হলো আল-মালহামা, যাকে অনেক ইসলামি বর্ণনায় ‘মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিস অনুযায়ী, এই যুদ্ধের মাধ্যমে দুনিয়ায় পুনরায় একটি ইসলামি খিলাফতের প্রতিষ্ঠা হবে—ইমাম মাহাদীর নেতৃত্বে।
ইরান ও ইসরায়েলের বর্তমান সংঘাতকে ঘিরে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এটাই কি সেই পূর্বাভাসিত যুদ্ধের সূচনা? বিশেষ করে যখন দেখা যাচ্ছে খোরাসানের মতো অঞ্চল থেকেই ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে কিছু সামরিক শক্তি, তখনই এই আলোচনা আরও জোরালো হচ্ছে।
মন্তব্য করুন