

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রোজা অবস্থায় মুখে দুর্গন্ধ হওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয়। দীর্ঘ সময় না খাওয়া ও না পান করার কারণে মুখ শুকিয়ে যায়, জিহ্বা ও দাঁতে জীবাণু জমে এবং পাকস্থলীর খালি অবস্থার কারণে বিশেষ ধরনের গন্ধ তৈরি হয়।
অনেকেই এ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন এবং ভাবেন—এই দুর্গন্ধ দূর করার জন্য কী করা জায়েজ, আর কী করলে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে?
মুখের দুর্গন্ধ সম্পর্কে হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি
রাসূলুল্লাহ (সা.) মুখের দুর্গন্ধকে রোজার একটি স্বাভাবিক ফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এর ফজিলতও বর্ণনা করেছেন।
আরও পড়ুনঃ রোজা রেখে সুরা বা অ্যালকোহল যুক্ত পারফিউম ব্যবহার।
তিনি বলেন,
“রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে কস্তুরীর সুগন্ধির চেয়েও বেশি প্রিয়।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রোজার কারণে যে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় তা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় নয়। বরং এটি রোজার ইবাদতের একটি আলামত।
তবে মানুষের সঙ্গে চলাফেরার ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং দুর্গন্ধ কমানোর চেষ্টা করা ইসলামের শিক্ষা।
মিসওয়াক ও দাঁত পরিষ্কার করা
রোজা অবস্থায় মুখের দুর্গন্ধ দূর করার সবচেয়ে উত্তম ও সুন্নতি উপায় হলো মিসওয়াক করা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মিসওয়াক মুখকে পরিষ্কার করে এবং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে।” (নাসাঈ, ইবন মাজাহ)
আরেক হাদিসে এসেছে,
“যদি আমার উম্মতের ওপর কষ্টের আশঙ্কা না থাকত, তবে আমি প্রত্যেক নামাজের সময় মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
ফকিহদের মতে, রোজা অবস্থায় মিসওয়াক করা জায়েজ—সকাল বা বিকাল উভয় সময়েই। এতে রোজা ভাঙে না, যতক্ষণ না মিসওয়াকের কোনো অংশ বা তার রস গিলে ফেলা হয়।
আরও পড়ুনঃ রোজা অবস্থায় চুল পড়া রোধে তেল ব্যবহার।
কুলি করা ও মুখ ধোয়া রোজা অবস্থায় কুলি করা (মুখে পানি নিয়ে ঘুরিয়ে ফেলা) জায়েজ এবং এটি দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা কুলি করো ও নাকে পানি দাও, তবে রোজা অবস্থায় বাড়াবাড়ি করো না।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রোজা অবস্থায় কুলি করা বৈধ, কিন্তু খুব গভীরভাবে বা জোরে করা যাবে না, যাতে পানি গলায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকে।
মুখের দুর্গন্ধের বড় কারণ হলো জিহ্বার ওপর জমে থাকা জীবাণু। তাই সকালে সেহরির পর ও ফজরের পর জিহ্বা পরিষ্কার করা উত্তম।
এটি ব্রাশ বা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে করা যেতে পারে, তবে টুথপেস্ট বা এমন কিছু ব্যবহার করা যাবে না যার স্বাদ গিলে ফেলার আশঙ্কা থাকে।
রোজা অবস্থায় দাঁত ব্রাশ করা জায়েজ, যদি টুথপেস্ট গিলে না ফেলা হয়। অনেক আলেম বলেন, শুধু পানি দিয়ে বা মিসওয়াক দিয়ে পরিষ্কার করাই উত্তম, কারণ এতে সন্দেহ কম থাকে।
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, “রোজা অবস্থায় দাঁত পরিষ্কার করা বৈধ, যতক্ষণ কিছু গিলে ফেলা না হয়।” (আল-মাজমু‘)
পানি ও খাবারের ভূমিকা
সেহরিতে পর্যাপ্ত পানি পান করা মুখের দুর্গন্ধ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি পেঁয়াজ, রসুন ও অতিরিক্ত ঝাল খাবার সেহরিতে কম খাওয়া ভালো, কারণ এগুলো থেকে মুখে দুর্গন্ধ বেশি হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“যে ব্যক্তি কাঁচা পেঁয়াজ বা রসুন খায়, সে যেন আমাদের মসজিদের কাছে না আসে।” (সহিহ মুসলিম)
আরও পড়ুনঃ রোজা রেখে স্বপ্নদোষ হলে গোসল কখন করতে হবে?
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মুখের দুর্গন্ধ ইসলামে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত। সুগন্ধি ব্যবহার
রোজা অবস্থায় পারফিউম বা আতর শরীরে ব্যবহার করা জায়েজ। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে নাকে টেনে গভীরভাবে শোঁকা থেকে বিরত থাকতে হবে।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন,
“আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রোজা অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার করতে দেখেছি।” (আবু দাউদ)
রোজা অবস্থায় মুখের দুর্গন্ধ দূর করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ ও প্রশংসনীয়, যতক্ষণ তা রোজা ভাঙার কারণ না হয়।
হাদিস থেকে প্রমাণিত যে মিসওয়াক, কুলি করা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সুন্নত।
তবে আমাদের মনে রাখতে হবে—রোজার কারণে সৃষ্ট দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় নয়; বরং এটি রোজার ইবাদতের চিহ্ন।
তাই পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে, রোজার আদব রক্ষা করে মুখের দুর্গন্ধ দূর করার চেষ্টা করাই একজন রোজাদারের জন্য উত্তম পথ।
মন্তব্য করুন

