

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রোজা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত, যা শুধু উপবাস থাকার নাম নয়, বরং নিয়ত, আত্মসংযম ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা একটি পূর্ণাঙ্গ আমল। রোজার ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে নিয়ত ছাড়া রোজা শুদ্ধ হয় না।
আমাদের সমাজে “নাওয়াইতু আন…” দিয়ে নিয়ত করার বিষয়টি খুব পরিচিত হলেও অনেকের মনে নিয়তের সঠিক অর্থ, শরিয়তসম্মত পদ্ধতি ও এর ফজিলত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই। তাই রোজার নিয়ত কী, কীভাবে করতে হয় এবং এর গুরুত্ব ও ফজিলত কী—এ বিষয়গুলো জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরি।
নিয়ত শব্দের অর্থ হলো মনের দৃঢ় সংকল্প বা ইচ্ছা। শরিয়তের পরিভাষায় নিয়ত বলতে বোঝায়—আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো ইবাদত করার সিদ্ধান্ত মনে পোষণ করা। রোজার নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা ফরজ নয়; বরং অন্তরে রোজা রাখার সংকল্প থাকলেই নিয়ত হয়ে যায়। এ বিষয়ে ইসলামী ফিকহের সকল মাযহাব একমত যে নিয়তের স্থান হলো অন্তর।
আরও পড়ুনঃ রোজা রেখে দুপুরে ঘুমালে কি শরীর দুর্বল হয়ে যায়?
তবে আমাদের সমাজে সহজভাবে বোঝানোর জন্য নিয়তের কিছু আরবি বাক্য প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো “নাওয়াইতু আন আসূমা…”। এই নিয়ত মুখে পড়া সুন্নত বা মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এতে অন্তরের নিয়ত আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু কেউ যদি মুখে এই বাক্য না পড়ে শুধু মনে মনে রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলেও তার রোজা সহিহ হবে।
বাংলায় প্রচলিত রোজার নিয়তের আরবি বাক্যটি হলো: “নাওয়াইতু আন আসূমা গাদান আন আদায়ি ফারদি শাহরি রমাদানা হাযিহিস সানাতি লিল্লাহি তাআলা।” এর বাংলা উচ্চারণ অনুযায়ী এটি সাধারণভাবে এভাবেই বলা হয়। এর অর্থ হলো—আমি আগামীকাল এই বছরের রমজান মাসের ফরজ রোজা আদায়ের নিয়ত করলাম, আল্লাহ তাআলার জন্য। এই অর্থ থেকেই বোঝা যায়, রোজার নিয়তের মূল বিষয় হলো ফরজ রোজা আদায়ের সংকল্প এবং তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া।
রোজার নিয়তের সময় সম্পর্কেও অনেকের মধ্যে প্রশ্ন থাকে। ফজরের আগে, অর্থাৎ সুবহে সাদিকের পূর্বে নিয়ত করা উত্তম। তবে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী রমজানের ফরজ রোজার ক্ষেত্রে ফজরের পর, এমনকি দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত নিয়ত করা জায়েজ, যদি সে সময় পর্যন্ত কোনো রোজাভঙ্গকারী কাজ না করে থাকে।
আরও পড়ুনঃ ইফতারে কোন ধরনের শরবত শরীরের জন্য সবচেয়ে ভালো?
অন্য মাযহাবগুলোতে সাধারণত ফজরের আগেই নিয়ত করা শর্ত হিসেবে বিবেচিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি ফজরের আগে রোজার নিয়ত করল না, তার রোজা নেই।” (সুনানে নাসাঈ)। এই হাদিসের আলোকে অধিকাংশ আলেম ফজরের আগেই নিয়ত করাকে উত্তম ও নিরাপদ মনে করেন।
রোজার নিয়তের ফজিলত অত্যন্ত বেশি। কারণ নিয়তের মাধ্যমেই একটি সাধারণ কাজ ইবাদতে পরিণত হয়। শুধু না খেয়ে থাকা যদি নিয়ত ছাড়া হয়, তবে তা ইবাদত নয়; কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে না খেয়ে থাকলেই তা ফরজ ইবাদতে রূপ নেয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সব কাজই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। এই হাদিস প্রমাণ করে যে রোজার মূল ভিত্তিই হলো নিয়ত।
নিয়তের মাধ্যমে রোজাদার সারা দিনের ইবাদতের সওয়াব পায়, এমনকি ঘুমের মধ্যেও সে ইবাদতের সওয়াব অর্জন করে। কারণ সে আল্লাহর আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে রোজা রেখেছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, “তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৩)। তাকওয়া অর্জনের এই উদ্দেশ্য নিয়তের মাধ্যমেই পূর্ণতা পায়।
আরও পড়ুনঃ রোজা অবস্থায় ব্যায়াম বা জিম করার সঠিক সময় কখন?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি যে, নিয়ত বারবার উচ্চারণ করা বা বিশেষ কোনো শব্দে পড়া আবশ্যক নয়। সহজভাবে মনে মনে এই সিদ্ধান্ত নেওয়াই যথেষ্ট যে, “আমি আগামীকাল রমজানের ফরজ রোজা রাখব।” এটুকুই শরিয়তের দৃষ্টিতে নিয়ত হিসেবে গণ্য হয়। অতিরিক্ত জটিলতা বা সন্দেহ সৃষ্টি করা ইসলামসম্মত নয়।
সবশেষে বলা যায়, রোজার নিয়ত হলো রোজার প্রাণ। মুখে “নাওয়াইতু আন…” পড়া সহায়ক হলেও ফরজ নয়, বরং অন্তরের দৃঢ় সংকল্পই আসল। নিয়তের মাধ্যমে রোজা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় এবং এর মাধ্যমে রোজাদার অসংখ্য ফজিলত ও সওয়াব অর্জন করে। তাই রমজানের প্রতিটি রোজায় সচেতনভাবে নিয়ত করা এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য খাঁটি রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন

