সোমবার
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইফতারে কোন ধরনের শরবত শরীরের জন্য সবচেয়ে ভালো?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৫০ পিএম
ইফতারে শরবত পান করছেন একজন নারী
expand
ইফতারে শরবত পান করছেন একজন নারী

রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের প্রথম পানীয় হিসেবে শরবত পান করা আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত অভ্যাস। দীর্ঘ সময় না খেয়ে ও না পান করে থাকার ফলে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায়।

এই অবস্থায় ইফতারে কী ধরনের শরবত পান করা উচিত, তা শরীরের সুস্থতা ও রোজার উপকারিতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব ধরনের শরবত শরীরের জন্য সমান উপকারী নয়। বরং ভুল শরবত নির্বাচন করলে উপকারের বদলে ক্ষতিই বেশি হতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ইফতারের সময় শরীরকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। হঠাৎ করে অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম রং বা কেমিক্যালযুক্ত পানীয় পান করলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায় এবং পরে হঠাৎ কমে গিয়ে দুর্বলতা তৈরি করে। তাই ইফতারের জন্য সবচেয়ে ভালো শরবত হলো প্রাকৃতিক, হালকা এবং সহজপাচ্য পানীয়, যা শরীরকে দ্রুত হাইড্রেট করে কিন্তু অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে না।

আরও পড়ুনঃ ইফতারের সময় আজান না শুনে ঘড়ি দেখে ইফতার করা যাবে কি?

ইসলামের দৃষ্টিতেও ইফতার সহজ ও পরিমিত হওয়া কাম্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণত খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার করতেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, তিনি বলতেন, “তোমাদের কেউ যখন ইফতার করবে, সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। যদি খেজুর না পায়, তবে পানি দিয়ে।” (সুনানে আবু দাউদ)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইফতারের জন্য সবচেয়ে উত্তম পানীয় হলো সাধারণ পানি বা প্রাকৃতিক উপাদানভিত্তিক পানীয়।

ইফতারের জন্য সবচেয়ে উপকারী শরবতের মধ্যে রয়েছে লেবুর শরবত। লেবুতে প্রাকৃতিক ভিটামিন সি ও খনিজ উপাদান থাকে, যা শরীরের পানিশূন্যতা দূর করে এবং ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। তবে লেবুর শরবতে অতিরিক্ত চিনি ব্যবহার করা উচিত নয়। অল্প চিনি বা মধু ব্যবহার করলে এটি আরও স্বাস্থ্যকর হয় এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও তুলনামূলক কম হয়।

আরও পড়ুনঃ সাহরি না খেয়ে রোজা রাখলে কি রোজা হবে?

আরেকটি অত্যন্ত উপকারী পানীয় হলো ইসবগুলের শরবত। ইসবগুল হজমে সহায়ক, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে এবং পাকস্থলীতে ঠান্ডা প্রভাব ফেলে। যারা রোজার সময় গ্যাস্ট্রিক বা পেটের সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য ইসবগুলের শরবত বিশেষভাবে উপকারী। এটি শরীরে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং সারাদিনের ক্লান্তি কমায়।

বেলের শরবতও ইফতারের জন্য একটি উৎকৃষ্ট প্রাকৃতিক পানীয়। বেল হজমশক্তি বাড়ায়, পাকস্থলী পরিষ্কার রাখে এবং শরীরকে ঠান্ডা রাখে। গরমের সময় রোজা রাখলে বেলের শরবত শরীরের জন্য খুবই উপকারী হতে পারে। তবে এখানেও অতিরিক্ত চিনি পরিহার করা জরুরি।

তোকমা বা সাবজা বীজের শরবত বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। তোকমা বীজ পানিতে ভিজিয়ে শরবত তৈরি করলে তা শরীরকে দীর্ঘ সময় হাইড্রেট রাখে এবং তৃষ্ণা কমায়। এতে থাকা আঁশ হজমে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখে। যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তাদের জন্য তোকমা শরবত একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ রোজা রেখে দুপুরে ঘুমালে কি শরীর দুর্বল হয়ে যায়?

অন্যদিকে বাজারজাত কৃত্রিম সিরাপ দিয়ে তৈরি শরবত শরীরের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। এসব সিরাপে সাধারণত অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম রং ও রাসায়নিক ফ্লেভার থাকে, যা পাকস্থলীতে অস্বস্তি সৃষ্টি করে, গ্যাস্ট্রিক বাড়ায় এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। রোজার মাসে নিয়মিত এসব শরবত পান করলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং রোজার প্রকৃত উপকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।

ইসলামে অপচয় ও ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না।” (সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ৩১)। অতিরিক্ত মিষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর শরবত এই সীমালঙ্ঘনের মধ্যেই পড়ে।

সবশেষে বলা যায়, ইফতারের জন্য সবচেয়ে ভালো শরবত হলো যেগুলো প্রাকৃতিক, কম চিনি ব্যবহার করা এবং সহজপাচ্য। লেবু, ইসবগুল, বেল বা তোকমা দিয়ে তৈরি শরবত শরীরকে দ্রুত হাইড্রেট করে, ক্লান্তি দূর করে এবং রোজা রাখাকে সহজ করে তোলে। কৃত্রিম সিরাপ ও অতিরিক্ত মিষ্টিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলাই স্বাস্থ্য ও ইবাদত—উভয়ের জন্যই উত্তম।

সুতরাং সচেতনভাবে শরবত নির্বাচন করলে ইফতার শুধু স্বস্তিদায়কই হবে না, বরং পুরো রমজান মাসজুড়ে শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতেও সহায়তা করবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X