

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাসে রোজা রাখার সময় অনেকেই সুস্থতা বজায় রাখতে ব্যায়াম বা জিম চালিয়ে যেতে চান। কিন্তু সারাদিন না খেয়ে ও না পান করে থাকার কারণে ব্যায়াম করার সঠিক সময় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
ভুল সময়ে বা ভুলভাবে ব্যায়াম করলে শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে, পানিশূন্যতা বাড়তে পারে এবং রোজা রাখা কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে। তাই রোজা অবস্থায় ব্যায়াম বা জিম করার ক্ষেত্রে সময় নির্বাচন ও মাত্রা নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজার সময় শরীর দীর্ঘ সময় শক্তি ও পানির ঘাটতির মধ্যে থাকে। এই অবস্থায় অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম করলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে যেতে পারে, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এজন্য রোজা অবস্থায় ব্যায়ামের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরকে সক্রিয় রাখা, না যে অতিরিক্ত ক্যালরি পোড়ানো বা ভারী ট্রেনিং করা।
আরও পড়ুনঃ সাহরি না খেয়ে রোজা রাখলে কি রোজা হবে?
রোজা রেখে ব্যায়ামের সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর সময় হিসেবে চিকিৎসকরা সাধারণত ইফতারের ঠিক আগে বা ইফতারের কিছুক্ষণ পরের সময়কে বেশি উপযোগী মনে করেন। ইফতারের ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে হালকা ব্যায়াম করলে শরীরে জমে থাকা ক্লান্তি কমে এবং ইফতারের মাধ্যমে দ্রুত শক্তি ও পানি পূরণ করা সম্ভব হয়।
তবে এই সময় ব্যায়াম অবশ্যই হালকা হতে হবে, যেমন হাঁটা, স্ট্রেচিং বা হালকা কার্ডিও। ভারী ওয়েট ট্রেনিং বা দীর্ঘ সময়ের জিম ওয়ার্কআউট এই সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ইফতারের পর ব্যায়াম করা অনেকের জন্য সবচেয়ে ভালো বিকল্প। ইফতারের পর শরীর পানি ও কিছু পুষ্টি পেয়ে যায়, ফলে ব্যায়ামের সময় ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি কম থাকে। সাধারণত ইফতারের ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা পর জিম বা ব্যায়াম করা সবচেয়ে উপযুক্ত।
এই সময়ে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ওয়েট ট্রেনিং, কার্ডিও বা যোগব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত ভারী ব্যায়াম করলে হজমে সমস্যা ও ক্লান্তি বেড়ে যেতে পারে, যা তারাবি ও রাতের ইবাদতে প্রভাব ফেলতে পারে। সেহরির আগে ব্যায়াম করার বিষয়টি চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তেমন উপযোগী নয়। এই সময় শরীর আগে থেকেই ক্লান্ত থাকে এবং ব্যায়াম করলে সেহরির পরপরই শরীর আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুনঃ রোজা রেখে দুপুরে ঘুমালে কি শরীর দুর্বল হয়ে যায়?
পাশাপাশি সেহরির সময় সীমিত থাকায় পর্যাপ্ত পানি ও বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও কমে যায়। তাই সাধারণত সেহরির আগে জিম বা ভারী ব্যায়াম পরিহার করাই উত্তম।
ইসলামের দৃষ্টিতেও শরীরের ওপর অযথা কষ্ট চাপানো নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমার শরীরেরও তোমার ওপর হক রয়েছে।” (সহিহ বুখারি)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইবাদতের পাশাপাশি শরীরের সুস্থতাও রক্ষা করা ইসলামের নির্দেশ। রোজা রেখে এমন ব্যায়াম করা, যা শরীরকে অসুস্থ করে তোলে বা ইবাদতে বাধা সৃষ্টি করে, তা কাম্য নয়।
রমজানের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন ও আত্মসংযম। অতিরিক্ত ব্যায়ামের মাধ্যমে যদি রোজার শান্তি, ধৈর্য ও ইবাদতে মনোযোগ নষ্ট হয়, তাহলে সেটি রোজার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই ব্যায়ামকে ইবাদতের সহায়ক হিসেবে দেখা উচিত, প্রতিযোগিতার মাধ্যম হিসেবে নয়।
যারা নিয়মিত জিম করেন এবং রমজানেও তা চালিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হলো ইফতারের পর সীমিত সময়ের ব্যায়াম। এতে শরীর শক্তি পায়, পেশি সচল থাকে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে। তবে ব্যায়ামের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং সেহরি ও ইফতারে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুনঃ ইফতারে কোন ধরনের শরবত শরীরের জন্য সবচেয়ে ভালো?
সবশেষে বলা যায়, রোজা অবস্থায় ব্যায়াম বা জিম করার সঠিক সময় মূলত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও ব্যায়ামের ধরন অনুযায়ী নির্ভর করে। সাধারণভাবে ইফতারের ৩০–৬০ মিনিট আগে হালকা ব্যায়াম বা ইফতারের ১.৫–২ ঘণ্টা পর মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম সবচেয়ে নিরাপদ ও উপকারী।
অতিরিক্ত ভারী ব্যায়াম ও ভুল সময় নির্বাচন করলে শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে, যা রোজা ও ইবাদত—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। অতএব ইসলামি শিক্ষা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে বলা যায়, রোজার সময় ব্যায়াম করা নিষিদ্ধ নয়, বরং সঠিক সময় ও পরিমিত মাত্রা বজায় রাখলে তা শরীর সুস্থ রাখতে সহায়ক হতে পারে এবং রোজা পালনকে আরও সহজ করে তোলে।
মন্তব্য করুন

