সোমবার
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোজা রেখে দুপুরে ঘুমালে কি শরীর দুর্বল হয়ে যায়?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম
রোজা রেখে দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছেন একজন মুসলিম ব্যাক্তি
expand
রোজা রেখে দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছেন একজন মুসলিম ব্যাক্তি

রমজান মাসে রোজা রাখার সময় দৈনন্দিন রুটিনে স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন আসে। সেহরি ও তারাবির কারণে রাতের ঘুম কমে যায়, ফলে অনেক রোজাদার দুপুরে কিছুটা ঘুমানোর প্রয়োজন অনুভব করেন।

কিন্তু এ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে, রোজা রেখে দুপুরে ঘুমালে কি শরীর আরও দুর্বল হয়ে যায়, নাকি এটি শরীরের জন্য উপকারী। বিষয়টি বুঝতে হলে শারীরিক বাস্তবতা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামের নির্দেশনা একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

রোজার সময় শরীর দীর্ঘ সময় খাবার ও পানি থেকে বিরত থাকে। এতে শরীরের শক্তির উৎস সীমিত হয়ে যায় এবং স্বাভাবিকের তুলনায় ক্লান্তি অনুভূত হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে যারা শারীরিক পরিশ্রম করেন বা রাতে পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন না, তাদের ক্ষেত্রে দুপুরের দিকে অবসাদ বা ঝিমুনি আসা খুবই সাধারণ বিষয়। এই অবস্থায় অল্প সময়ের জন্য ঘুম শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা উপকারী হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ সেহরির শেষ সময়ের কতক্ষণ পর পর্যন্ত খাওয়া জায়েজ?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, দুপুরে স্বল্প সময়ের ঘুম বা ‘পাওয়ার ন্যাপ’ শরীর ও মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়। এতে ক্লান্তি কমে, মনোযোগ বাড়ে এবং কর্মক্ষমতা কিছুটা ফিরে আসে। রোজার সময় যেহেতু শরীর নতুন রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়, তাই দুপুরে ২০ থেকে ৪০ মিনিট ঘুম শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করে। এতে শরীর দুর্বল হওয়ার বদলে বরং শক্তি সঞ্চয় হয়।

তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন দুপুরের ঘুম অতিরিক্ত দীর্ঘ হয়। দীর্ঘ সময় ঘুমালে শরীর আরও অলস হয়ে যেতে পারে, মাথা ভার লাগতে পারে এবং ঘুম থেকে ওঠার পর দুর্বলতা বেড়ে যাওয়ার অনুভূতি হতে পারে। বিশেষ করে যারা দুপুরে দুই থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমান, তাদের ক্ষেত্রে রাতে ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়, যা পরদিন রোজার সময় আরও ক্লান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই দুপুরে ঘুমের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামের দৃষ্টিতেও বিশ্রাম নেওয়া নিষিদ্ধ নয়। বরং শরীরকে সুস্থ রাখাকে ইসলাম একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমার শরীরেরও তোমার ওপর হক রয়েছে।” (সহিহ বুখারি)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নেওয়া বৈধ এবং প্রয়োজনীয়। সাহাবিদের জীবনেও দেখা যায়, তারা কাজের ফাঁকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নিতেন।

আরও পড়ুনঃ ইফতারের সময় আজান না শুনে ঘড়ি দেখে ইফতার করা যাবে কি?

রমজানের প্রেক্ষাপটে দুপুরে অল্প সময় ঘুম ইবাদতের ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে। কারণ পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেলে মানুষ ইবাদতে মনোযোগ হারায়, ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং রাগ বা বিরক্তি বাড়তে পারে। অল্প বিশ্রাম নিলে শরীর ও মন সতেজ থাকে, ফলে আসরের পর ও রাতের ইবাদত আরও সুন্দরভাবে আদায় করা সম্ভব হয়।

তবে দুপুরে ঘুমানোর সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস ও পানির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সেহরিতে যদি পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা হয়, তাহলে শরীর তুলনামূলক কম দুর্বল হয়। সঠিক সেহরি না খেয়ে শুধু ঘুমের ওপর নির্ভর করলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই দুপুরে ঘুমকে কখনোই সেহরির বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।

কিছু মানুষ মনে করেন, রোজা রেখে দিনে ঘুমালে ইবাদতের সময় নষ্ট হয়। কিন্তু বাস্তবে ইসলাম ঘুমকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং উদ্দেশ্যহীন অলসতা ও সময় নষ্ট করাই নিন্দনীয়। যদি দুপুরে অল্প ঘুম শরীরকে সতেজ করে এবং বাকি সময় ইবাদত, কাজ বা দায়িত্ব পালনে সাহায্য করে, তাহলে তা নেতিবাচক নয়।

আরও পড়ুনঃ সাহরি না খেয়ে রোজা রাখলে কি রোজা হবে?

চিকিৎসকদের মতে, রোজার সময় দুপুরে ঘুমালে শরীর দুর্বল হয়ে যায়—এ ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং ঘুমের সময় ও পরিমাণ সঠিক না হলে সমস্যা তৈরি হয়। নিয়মিত রুটিন, হালকা শারীরিক চলাফেরা এবং অতিরিক্ত অলসতা পরিহার করলে দুপুরের ঘুম শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয় না।

সবশেষে বলা যায়, রোজা রেখে দুপুরে ঘুমানো নিজে নিজে শরীর দুর্বল করে না। বরং সীমিত সময়ের ঘুম শরীরকে বিশ্রাম দেয় এবং ক্লান্তি কমায়। তবে অতিরিক্ত ঘুম, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও ভুল খাদ্যাভ্যাস শরীরকে দুর্বল করে তুলতে পারে।

সুতরাং ইসলামি শিক্ষা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে বলা যায়—রোজার সময় দুপুরে ২০ থেকে ৪০ মিনিটের পরিমিত ঘুম জায়েজ এবং অনেক ক্ষেত্রে উপকারী। এতে শরীর দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা নেই, বরং সঠিকভাবে করলে রোজা রাখা ও ইবাদত করা আরও সহজ ও স্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X