


সরকার গঠনের সুযোগ পেলে কর্মজীবী মা দের কর্মঘন্টা কমিয়ে ৫ ঘন্টা করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তারা ৫ ঘন্টা কাজ করেই পুরো সময়ের বেতন পাবেন। যা সরকার ব্যবস্থা করবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানী ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে জামায়াত কর্তৃক আয়োজিত৷ 'বাংলাদেশের জন্য ব্যবসাবান্ধব অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন বা 'দ্যা প্রোসপারিটি ডায়ালগ, স্ট্র্যাটেজিক থটস ফর ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ট্রেড অফ বাংলাদেশ' শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান চাকরিজীবী মা দের কথা বলতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ তাআলা নারীদের কিছু বিশেষ গুণ দিয়েছেন, যা পুরুষদের নেই। সন্তান ধারণ, বুকের দুধ পান করানো ও মাতৃত্বের দায়িত্ব মাকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। তাই সমাজে মা দের সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।
তিনি আরো বলেন, একজন মা গর্ভধারণ করেন। দুই থেকে আড়াই বছর সন্তানকে দুধ পান করান এবং এরপর আবার আট ঘণ্টার কর্মজীবনে যুক্ত হন। এই সময় তার জন্য স্বস্তিকর কর্মপরিবেশ প্রয়োজন। অনেক মা সন্তান রেখে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে না পেরে চাকরি ছেড়ে দেন। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন ব্যবস্থা করা, যাতে মা কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন এবং সন্তানের ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত হয়। কেউ এক বছর পর কাজে ফিরতে চাইলে বাধা থাকবে না, আবার কেউ দুই বা আড়াই বছর সময় নিলে সেটিও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।
জামায়াত আমির বলেন, কর্মজীবী মায়েরা যদি তার সন্তানকে সঠিকভাবে সময় দিতে পারেন তবে দেশের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত হবে। এর পাশাপাশি যতটুকু সময় মা কাজ করবেন ততটুকু সময় সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
এছাড়া ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময়ে জামায়াত আমির বলেন, ব্যবসায়ীদের মূল সমস্যা তিনটি। তার মধ্যে অন্যতম লাল ফিতার দৌঁড়াত্ম। এ লাল ফিতার সংস্কৃতি চিরতরে ভেঙে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেন জামায়াতের আমির। এর পাশাপাশি ঘুষের নামে ‘স্পিড মানি’ আর চলবে না বলেও তার বক্তব্যে জোর প্রদান করেন। তিনি আরো বলেন, ব্যবসা ও শিল্পকে শিশুর মতো আগলে রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশীয় বিনিয়োগকারী নিরাপত্তাহীন হলে বিদেশিরা কেন আসবে?ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং সুবিধা দিলে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করার প্রবণতা কমে আসবে। পাচারকৃত অর্থ সম্মানের সঙ্গে ফেরত আনতে আহ্বান জানানো হবে।
জামায়াত আমির বলেন, দেশীয় বিনিয়োগকারীরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কেন—এই প্রশ্ন রাষ্ট্রকে আগে সমাধান করতে হবে। তহবিলের নিরাপত্তাহীনতা, সম্পদের সুরক্ষার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতিকে শিল্প মালিকদের প্রধান তিনটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
জামায়াত আমির অঙ্গীকার করেন, ক্ষমতায় গেলে লাল ফিতা সংস্কৃতি চিরতরে ভেঙে দেওয়া হবে এবং জনগণের আমানতের বোঝা বহন করা কোনো দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। “ক্ষমতায় গিয়ে যেন কারও সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে না বাড়ে, আত্মীয়স্বজন যেন রাতারাতি ধনী না হয়—এই সংস্কৃতিও ভাঙতে হবে,” বলেন তিনি।
চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতির প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজি মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। এই যন্ত্রণা তারা নিজেরাও অনুভব করেন এবং অঙ্গীকার করেন—মানুষকে হালাল রুজির ধারায় ফিরিয়ে আনা হবে। “১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি হাত একত্র করে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে চাই,” বলেন তিনি।
ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই দুই খাতের মধ্যে গভীর আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানান, তিনি যে ব্যাংকের ক্ষুদ্র সদস্য ছিলেন, সেই ব্যাংকই আবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একটি ব্রোকারেজ হাউসের সদস্য ছিল। ফলে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারকে একসঙ্গে বোঝার সুযোগ পান তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা জমা রাখে; কিন্তু উদ্যোক্তা দক্ষতা না থাকায় সেই অর্থ তুলে দেওয়া হয় অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের হাতে। একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে সুস্থ থাকলেও পরবর্তীতে একের পর এক সংকটে পড়ে শেয়ারবাজার ও ব্যাংকিং খাত।
দেশের উন্নয়নের জন্য তিনটি খাতকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। তার ভাষায়, মানুষের মেধা, যোগ্যতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও পরিশ্রম—এই চারটির সমন্বয় ঘটলে কোনো শিল্পই ব্যর্থ হয় না। ব্যবসায়িক সফলতার জন্য তিনি চারটি গুণকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন—সহি নিয়ত, জ্ঞান, সাহস ও পরিশ্রম। জামায়াত আমির জানান, বাংলাদেশের শীর্ষ ২৭টি প্রতিষ্ঠানের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, এর মধ্যে ২১টির উদ্যোক্তাদের কোনো পারিবারিক পুঁজি ছিল না। তারা ক্ষুদ্র মূলধন, সততা ও সাহস নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।
ব্রুনাই সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে শাসক ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব নেই। সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত এবং শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা—কেউই সন্তুষ্ট নয়।
নিজেকে একজন সাধারণ কৃষকের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে দেশের সাধারণ মানুষের অবদান রয়েছে। কারণ দরিদ্র মানুষও ভ্যাট দেয় এবং সেই অর্থেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। তাই সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকা প্রত্যেকের কর্তব্য।
শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, শিল্পকে শ্রমিকের সন্তানের মতো ভালোবাসতে হবে এবং মালিকদের শ্রমিকদের সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা ভুল করলে তিনি প্রকাশ্যে অপমান না করে আলাদাভাবে সংশোধনের সুযোগ দিয়েছেন।
আয়োজিত অনুষ্ঠানে কি-নোট প্রেজেন্টেশন করেন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস এন্ড ইকোনমির অধ্যাপক ড একেএম ওয়ারেসুল করিম। সভায় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, এ কে আজাদ ও মো. জসিম উদ্দিন, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, বারভিডা সভাপতি আব্দুল হকসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন