


বর্ষা এলে ঢাকার অন্য আর দশটি নগরবাসীর মনে স্বস্তি বা আনন্দের অনুভূতি তৈরি হলেও নিকুঞ্জ টানপাড়ার বাসিন্দাদের মনে তৈরি হয় এক গভীর অজানা আতঙ্ক। আকাশে কালো মেঘ জমে উঠলেই প্রতিটি ঘরে প্রশ্ন জাগে—এবার কতটা পানি জমবে? কত দিন গৃহবন্দী থাকতে হবে? কত ঘণ্টা প্রধান রাস্তায় হাঁটু থেকে কোমরসমান নোংরা পানি থইথই করবে? সন্তানকে কি নিরাপদে স্কুলে পাঠানো যাবে? কোনো মুমূর্ষু রোগীকে কি সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে? নাকি গতবারের মতো এবারও জীবনের স্বাভাবিক গতি স্তব্ধ হয়ে যাবে? নিকুঞ্জ টানপাড়ার সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি পরিবারের কাছে জলাবদ্ধতা এখন আর কেবল কোনো সাময়িক নাগরিকে ভোগান্তি বা মৌসুমি সমস্যা নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে বয়ে চলা এক গভীর ও যন্ত্রণাদায়ক অভিশাপ। বর্ষার কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে এমনভাবে থামিয়ে দেয়, মনে হয় আমরা রাজধানী ঢাকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত এলাকায় নয়, বরং বিচ্ছিন্ন ও অভিশপ্ত কোনো জলমগ্ন দ্বীপে বসবাস করছি।
কয়েক মাস আগের সেই দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা এলাকার কোনো অধিবাসী কিংবা ভুক্তভোগীর পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টির পর নিকুঞ্জ টানপাড়া, জামতলা এবং এর সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় ৯ দিন ধরে সম্পূর্ণ পানির নিচে নিমজ্জিত ছিল। এটি কেবল কয়েক ঘণ্টার নোংরা পানি জমার গল্প নয়, বরং টানা ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একটি পুরো জনপদের স্তব্ধ হয়ে থাকার এক বাস্তব চিত্র। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, বাসাবাড়ির প্রবেশপথ, এমনকি বহু ভবনের নিচতলা পর্যন্ত নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি ঢুকে পড়েছিল। একজন গৃহিণী ঘর থেকে বের হতে পারছেন না, একজন শিক্ষার্থী তার কাঙ্খিত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না, একজন চাকরিজীবী প্রতিদিনের উপার্জনের পথ হারাচ্ছেন, আর একজন বৃদ্ধ কিংবা জটিল রোগী চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার সুযোগ পাচ্ছেন না—এসব মর্মান্তিক বাস্তবতা কোনো সরকারি পরিসংখ্যান কিংবা বাজেটের অঙ্ক দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। পানি একসময় শুকিয়ে যায়, কিন্তু জলমগ্নতায় জমে থাকা পলি, দুর্গন্ধ আর মানুষের মনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক এত সহজে মুছে যায় না।
অঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে নগর-পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ এবং হাইড্রোলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা বহু বছর ধরে আলোচনা-গবেষণা করছেন। তাদের মতে, সমস্যাটি শুধু নর্দমা পরিষ্কার না করা বা দু-একটি ম্যানহোলের জট ছাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা নিম্নাঞ্চল ও জলাধার ভরাট, প্রধান ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের মারাত্মক ধারণক্ষমতার অভাব, বিভিন্ন নালা ও খালের মধ্যে সংযোগের তীব্র সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব—সব মিলিয়ে এই সংকট এক জটিল রূপ ধারণ করেছে। ২০২৬ সালের বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশন যৌথ সমীক্ষা চালিয়ে জলাবদ্ধতার তীব্র ঝুঁকিতে থাকা ১৪১টি অতিসংবেদনশীল স্থান চিহ্নিত করেছিল। এর মধ্যে কেবল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার আওতাতেই পড়েছিল ১০৮টি সংবেদনশীল হটস্পট, যার অন্যতম শীর্ষতালিকায় রয়েছে এই নিকুঞ্জ টানপাড়া ও জামতলা এলাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানকার মূল কারিগরি ত্রুটি হলো অলিগলির ছোট ড্রেন বা সংযোগ নালাগুলোর সাথে প্রধান নিষ্কাশন কাঠামোর কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। ফলে বৃষ্টির পানি কোথাও জমা হলে তা বের হওয়ার স্বাভাবিক গতি পায় না।
নিকুঞ্জ টানপাড়ার ভৌগোলিক অবস্থান ও আশপাশের অবকাঠামোগত কাঠামোর দিকে তাকালে এই সংকট আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়। এলাকাটি একদিকে নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা, অন্যদিকে জামতলা ও খিলক্ষেত প্রশাসনিক অঞ্চলের সাথে যুক্ত। এর খুব কাছেই রয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে। বিগত এক দশকে এই মেগা অবকাঠামো কাঠামোগুলো নির্মাণের সময় প্রাকৃতিকভাবে পানি বের হওয়ার কালভার্ট, নিম্নাঞ্চল ও জলাধারগুলো সংকুচিত বা পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (IWM)-এর বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার যেকোনো এলাকার ড্রেনেজ কার্যকর রাখতে হলে নিকটস্থ খালের সাথে নিখুঁত সংযোগ থাকতে হয়। কিন্তু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং সংলগ্ন ফ্লাইওভার ও মেগা প্রজেক্টগুলোর প্রভাবে নিকুঞ্জ টানপাড়ার স্থানীয় হাইড্রোলজিক্যাল কানেক্টিভিটি বা পানি প্রবাহের দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে প্রতিবার অতিবৃষ্টি হলে পানি নিষ্কাশনের মূল আউটফলগুলো বিপরীতমুখী চাপে আটকে যায়।
গত বর্ষায় যখন এলাকাটি দীর্ঘ ৯ দিন পানির নিচে তলিয়ে ছিল, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জরুরি পাম্প স্থাপন করা হয়, বন্ধ ম্যানহোল সাময়িকভাবে খুলে দেওয়া হয় এবং পানির বিকল্প পথ বের করার চেষ্টা চলে। ১০ জুলাই ডিএনসিসির জোন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুজ্জামান খান সরেজমিনে গিয়ে নিকুঞ্জ টানপাড়া ও জামতলা এলাকার জলমগ্ন রাস্তাঘাট পরিদর্শন করেন এবং ক্ষুব্ধ অধিবাসীদের সাথে কথা বলেন। একজন দায়িত্বশীল সরকারি প্রকৌশলীর অফিসে বসে ফাইল দেখার চেয়ে পানিতে নেমে বাসিন্দাদের দুর্ভোগ প্রত্যক্ষ করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে পাম্প চালিয়ে কয়েক হাজার গ্যালন পানি সেচে ফেলা আর জলাবদ্ধতার স্থায়ী বৈজ্ঞানিক সমাধান করা যে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়—তা আমাদের বুঝতে হবে। সাময়িক পাম্পের মাধ্যমে পানি সরালে সাময়িক স্বস্তি মেলে, কিন্তু পরবর্তী বৃষ্টির সাথে সাথে সেই একই স্থানে একই গভীরতায় পানি জমা হয়। পাম্প কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; এটি কেবল মূল রোগের ওপর সাময়িক ব্যথানাশক প্রলেপ মাত্র।
একটি সমৃদ্ধ নগরীর কোনো আবাসিক এলাকায় জলাবদ্ধতার স্থায়ী নিরসন তখনই সম্ভব, যখন বৃষ্টির পানি দ্রুত সংগ্রহ, পরিবহন ও মূল নদীতে নির্গমনের একটি ধারাবাহিক ও স্বয়ংসক্রিয় প্রবাহ থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী সময়কালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নতুন ড্রেন নির্মাণ, নর্দমা সম্প্রসারণ এবং বক্স কালভার্ট তৈরি বাবদ ২৬২ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। একই সাথে নগরীর জলাভূমি ও প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণের সক্ষমতা গত তিন দশকে আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। নগর বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কারভাবে বলছেন, শত শত কোটি টাকা অবকাঠামো খাতে খরচ হলেও যদি বৃষ্টিতে জনপদ দিনের পর দিন পানির নিচে থাকে, তবে আমাদের নকশা, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দূরদর্শিতা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলা অপরিহার্য। প্রশ্নটি শুধু কত কোটি টাকা বরাদ্দ বা খরচ হয়েছে তা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি হলো এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পর আমরা পানি বের হওয়ার কোনো বিজ্ঞানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন আউটফল পথ তৈরি করতে পেরেছি কি না।
অবকাঠামোগত ত্রুটির পাশাপাশি নিকুঞ্জ টানপাড়ার স্থানীয় পানি নিষ্কাশন সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে নিকটস্থ প্রাকৃতিক জলাশয় ও খালগুলোর বর্তমান করুণ অবস্থা। একসময় খিলক্ষেত ও নিকুঞ্জ সংলগ্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক নালা ও খাল বিদ্যমান ছিল, যা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানিপ্রবাহকে সুতিজোড়া ও বালু নদীর দিকে সরিয়ে নিতে প্রাকৃতিক নিষ্কাশন পথ হিসেবে কাজ করত। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত জমি ভরাট, অবৈধ দখল এবং অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপনা নির্মাণের কারণে এই প্রাকৃতিক জলপথগুলো আজ হয় বিলুপ্ত, না হয় মারাত্মকভাবে সংকুচিত। যখন কোনো নগরীর প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো তাদের স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তখন কেবল ভূগর্ভস্থ কৃত্রিম ড্রেন বা পাইপলাইনের ওপর নির্ভর করে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টির পানি অপসারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে ড্রেনের ভেতরে জমে থাকা পানি উল্টো পলি ও আবর্জনা নিয়ে লোকালয়ে উপচে পড়ে, যা সাধারণ নাগরিক দুর্ভোগকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
নিকুঞ্জ টানপাড়ার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী বা বিলাসিতাপূর্ণ নয়। এই এলাকার মেহনতী ও মধ্যবিত্ত অধিবাসীরা কোনো কৃত্রিম লেক, ঝকঝকে পার্ক কিংবা বিশাল কোনো প্রদর্শনীর উন্নয়ন প্রকল্প দাবি করছেন না। তাদের দাবি অতি সাধারণ ও মৌলিক—বৃষ্টি হলে যেন তাদের প্রিয় বসতঘরে পানি না ঢোকে, সন্তানকে কোলে তুলে নোংরা পানির ভেতর দিয়ে স্কুলে যেতে না হয়, অসুস্থ প্রবীণ স্বজনকে হাসপাতালে নেওয়ার রাস্তা যেন সচল থাকে, আর বৃষ্টির রাত মানেই যেন বিদ্যুৎহীন অন্ধকার, মশার উপদ্রব এবং নোংরা পানির পচা দুর্গন্ধের ভয়াবহ রাত না হয়। যখন একজন সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ নিজের ঘরের দরজা খুলে দেখেন সামনের গলিতে কোমরসমান দুর্গন্ধযুক্ত পানি থইথই করছে, তখন সরকারের মেগা প্রকল্পের সব পরিসংখ্যান ও উন্নয়নের তথ্য তার কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়ে। একজন মা যখন শিশু সন্তানকে নিয়ে জলমগ্ন রাস্তার পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনহীন দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন কোনো বরাদ্দের ফাইল তার দুশ্চিন্তা কমাতে পারে না। সাধারণ নাগরিক কেবল একটি জিনিসই দেখতে চায়—কাজের কার্যকর ও স্থায়ী ফলাফল। এই জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে কেবল বর্ষা আসার এক সপ্তাহ আগে নালা পরিষ্কারের প্রচলিত ঢাকঢোল পেটানো কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। জলাবদ্ধতা হয়তো মৌসুমি কিন্তু এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হওয়া উচিত বছরব্যাপী ও ধারাবাহিক। একটি পূর্ণাঙ্গ "প্রিভেন্টিভ ড্রেনেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম" গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে শহরের কোথায় বর্জ্য জমে ড্রেনের ধারণক্ষমতা কমেছে, কোথায় অবৈধ দখল হয়েছে, কোথায় ম্যানহোলের ঢাকনা ভাঙা বা আউটফল অবরুদ্ধ—তার হালনাগাদ তথ্য প্রতিনিয়ত ডিজিটাল ডাটাবেজে যুক্ত থাকবে। কেবল সিটি করপোরেশন বা নগর কর্তৃপক্ষের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেদের নাগরিক দায় এড়ানোর সুযোগও অবশ্য আমাদের নেই। আমরা নিজেরা যদি বাসাবাড়ির বর্জ্য, প্লাস্টিক বোতল, পলিব্যাগ কিংবা গৃহস্থালি উচ্ছিষ্ট যত্রতত্র ড্রেনে ফেলে নিষ্কাশনের মুখ বন্ধ করে দিই, তবে কেবল প্রশাসনকে দোষ দেওয়া যুক্তিসঙ্গত হবে না। তবে নাগরিক সচেনতার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের কঠোর প্রশাসনিক আইনি নজরদারিও জরুরি, যাতে ড্রেনে নির্মাণসামগ্রী ও পলি ফেলে পানির প্রবাহ বন্ধকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা যায়।
এখন সময় এসেছে নিকুঞ্জ টানপাড়া ও এর সংলগ্ন এলাকার ভৌগোলিক জটিলতা বিবেচনায় নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ও সমন্বিত "মাস্টারপ্ল্যান" বা কৌশলগত রূপরেখা বাস্তবায়ন করার।
এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপে আধুনিক জিআইএস (GIS) প্রযুক্তির সাহায্যে পুরো এলাকার প্রতিটি অলিগলি, ড্রেন, আউটফল ও সংলগ্ন জলাধারের উচ্চতা ও পলি জমার স্তর চিহ্নিত করে একটি ডিজিটাল হাইড্রোলজিক্যাল ম্যাপ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপে প্রতিটি ড্রেনের ধারণক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখতে হবে তা প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ কত মিলিমিটার বৃষ্টির পানি সরাতে সক্ষম।
তৃতীয় ধাপে পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে ও বিমানবন্দর এলাকার মূল নিষ্কাশন নালার সাথে নিকুঞ্জ টানপাড়ার ড্রেনেজ আউটফলের নিরবচ্ছিন্ন ও কার্যকর সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে।
চতুর্থ ধাপে ডিএনসিসি, রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বেবিচকের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ কারিগরি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করতে হবে, যেন কোনো নতুন অবকাঠামো প্রকল্প ড্রেনেজ প্রবাহে বাধা তৈরি করার আগে নিখুঁত "ড্রেনেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট" (DIA) নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকে।
পাশাপাশি, এই সমাধান প্রক্রিয়াকে টেকসই ও গণমুখী করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কেবল ওপর থেকে কোনো পরিকল্পনা চাপিয়ে না দিয়ে, খিলক্ষেত টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি সহ স্থানীয় সামাজিক সংগঠন, এলাকাভিত্তিক কল্যাণ সমিতি এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গড়ে তোলা যেতে পারে। এই কমিটি নগর কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত বৈঠক করবে, ড্রেনেজ সংস্কারকাজের মান পর্যবেক্ষণ করবে এবং কোথায় পলি জমছে বা কোথায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে তা তাৎক্ষণিকভাবে ডিএনসিসিকে অবহিত করবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সক্রিয় তদারকি ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালে যেকোনো প্রশাসনিক উদ্যোগের সফলতা ও জবাবদিহি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। একটি স্বচ্ছ নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে কেবল প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস পাবে না, বরং প্রকল্পগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতাও সুনিশ্চিত হবে।
নিকুঞ্জ টানপাড়া কি আসলেই একদিন সম্পূর্ণ জলাবদ্ধতামুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ আবাসিক এলাকায় রূপান্তরিত হতে পারবে? আধুনিক নগর প্রকৌশল ও হাইড্রোলজিক্যাল বিজ্ঞানের আলোকে বলা যায়—অবশ্যই সম্ভব। পৃথিবীর বহু নিচু নগরী বা সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচের শহরও নিখুঁত প্রকৌশল বিদ্যা, খাল সংস্কার ও বৈজ্ঞানিক পাম্পিং সিস্টেমের মাধ্যমে নিজেদের সম্পূর্ণ শুষ্ক রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর জন্য আমাদের প্রয়োজন সঠিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দূরদর্শী প্রকৌশল নকশা এবং স্থানীয় অধিবাসীদের দায়িত্বশীল নাগরিক মানসিকতা। আমরা আর কোনো বর্ষার মৌসুমে দেখতে চাই না যে একটি পরিশ্রমী অধিবাসীদের পুরো জনপদ টানা ৯ দিন ধরে পানির সাথে জীবনসংগ্রাম করছে। কথায় নয়, আমরা কাজের মাধ্যমে সময়াবদ্ধ, দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখতে চাই।
যেদিন আকাশে কালো মেঘ জমলে কোনো মা আঁতকে উঠবেন না, শিশুরা নিশ্চিন্তে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি উপভোগ করবে, কর্মজীবী মানুষ সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাবেন—সেদিনই আমরা বলতে পারব নিকুঞ্জ টানপাড়া সত্যিই জলাবদ্ধতার চিরন্তন অভিশাপ থেকে চিরতরে মুক্ত হয়েছে। লেখক পরিচিতি: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং সভাপতি খিলক্ষেত টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি।