


নিয়মিত যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে বসে থেকে তীব্র গরমে ঘামে ভিজে একাকার। একদিকে এমন চরম অশান্তি, অন্যদিকে পরিবহন শ্রমিকদের দুর্ব্যবহার, চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যাতায়াত, বায়ুদূষণ, ধুলাদূষণ, শব্দদূষণসহ নানান কারণে চরম বিরক্তি থেকে মানুষের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিকেল ৫টায় অফিস ছুটির পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন দুর্ভোগ মাড়িয়ে রাত ৮টা বা ৯টায় বাসায় ফেরলে স্ত্রীরা সন্দেহের চোখে দেখে। অনেক পরিবারে প্রায়ই এসব নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণে সংসার ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে ৫০ শতাংশ। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশ এবং স্নায়বিক ক্ষতির অন্যতম কারণও অতিরিক্ত যানজট বলে মনে করেন তারা। অপরাধবিজ্ঞানীরা বর্তমানে টিনএজদের বিপথগামিতা (মব সংস্কৃতি), যানজট, শব্দদূষণ ও বেকারত্বকে প্রধান কারণ বলে মনে করেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘ যানজটে সময় ও আর্থিক ক্ষতি যেমন হচ্ছে, তেমনি যাত্রীসাধারণের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও কয়েকগুণ বেশি। ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুস ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও প্রজননতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজধানীতে যানজটের তীব্রতা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। মারাত্মকভাবে শব্দ ও বায়ুদূষণও বাড়ছে। এতে যাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলেছে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যাত্রী হয়রানি ও ভাড়া নৈরাজ্য আরেক দফা বেড়েছে। কমেছে সড়কে মানুষের যাতায়াতের নিরাপত্তা। ভুক্তভোগীদের কাছে সড়ক এখন মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। রাজধানীসহ দেশের শহরগুলো এখন ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য। এমন ছিনতাইয়ের সিসি ক্যামেরায় সংরক্ষিত নানান ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। জাতীয় মহাসড়কের কিছু কিছু চিহ্নিত এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই ডাকাতদের উল্লাস মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।
সরকার পরিবর্তনের পালাবদলে দীর্ঘ কয়েক মাস ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতি, আইন প্রয়োগে শিথিলতা ও গাফিলতির সুযোগে দেশের সড়ক-মহাসড়কে সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা, নসিমন-করিমন, রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেল ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সড়কে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা আরও বেড়েছে। দূরপাল্লার বাসে মফস্বল থেকে এসে যেকোনো নগরীতে ভোর বা গভীর রাতে নামলেই ভীতি ও আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে বাসায় ফেরেন যাত্রীসাধারণ। অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে বাসায় ফেরেন।
বিগত সরকার পরিবহন পরিচালনায় অদূরদর্শিতার কারণে দেশের নাগরিকেরা প্রতিদিনের যাতায়াতে নানামুখী ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। বিশৃঙ্খল সড়কব্যবস্থা ও আইনপ্রয়োগে শিথিলতা, গাফিলতি বা আইনের অপপ্রয়োগের কারণে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের চেয়েও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিগত ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে ৬২,৬১৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮৬,৬৯০ জন নিহত এবং ১,৫৩,২৫৭ জন আহত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসেবে অসহনীয় যানজটে প্রতিদিন কেবল রাজধানীতে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি ৯৮ হাজার কোটি টাকা। এসব যানজটে আটকে থাকা যানবাহনে প্রতিদিন জ্বালানি অপচয় হচ্ছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার।
এমন নাগরিক বঞ্চনায় অতিষ্ঠ হয়ে এসব সমস্যা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশের ইতিহাসে সাড়া জাগানো সর্ববৃহৎ নাগরিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনে সরকার ও প্রশাসন সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছিল— তাদের চোখ খুলে গেছে। আন্দোলনের তেরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সড়ক পরিবহনের নতুন আইন করল। আইনের বিধিমালাও হলো, বাস্তবায়নও হলো। কিন্তু নতুন আইনে সড়কে শৃঙ্খলা আসেনি, দুর্ঘটনা কমেনি— বরং বাড়ছেই।
পরিবহন খাতসহ দেশের সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার শতসহস্র তাজা প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত এখনো নিশ্চিত হয়নি।
পরিবহনের অন্যতম প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত বা ভুক্তভোগী যাত্রীসাধারণ হলেও, আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ১৬ বছর পরিবহন পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান স্টেকহোল্ডার যাত্রীসাধারণের মতামত ও প্রতিনিধিত্ব বাদ দিয়ে সরকারের অনুগত লেজুরভিত্তিক একটি বাস মালিক সমিতি ও একটি পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্বে পরিবহন সেক্টর পরিচালনা করতে গিয়ে সবকিছু যেন লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি করেছিল— এখনো তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত।
ফলে পরিবহনে যানজট, বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, ভাড়া নৈরাজ্য, যাত্রী হয়রানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েই চলেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যাত্রীসাধারণের সঙ্গে সরকারের কোনো যোগাযোগের উপায় ছিল না। পরিবহন সেক্টরে যাত্রী স্বার্থের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হতো বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের গুটিকতক নেতার প্রেসক্রিপশনে। ফলে যাত্রীসেবার মান বাড়েনি, পরিবহনের পরিবেশ উন্নত হয়নি, বরং মান কমতে কমতে বর্তমানে রাজধানীর কোনো বাসে একজন ভদ্রলোকের সম্মান ও নাগরিক মর্যাদা নিয়ে যাতায়াতের পরিবেশ নেই।
সিটি সার্ভিসের বাসগুলোর আসনে বসা যায় না। সিটগুলো ময়লা, আবর্জনা, তেলচিটচিটে, শেওলাপড়া অবস্থায়; পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। সিট ভাঙা, দরজা-জানালা ভাঙা, বাসের ছালতা উঠে গেছে বহুযুগ আগে। এসব মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়ঝক্কড় বাস উচ্ছেদের নামে নানান তালবাহানা, নানান আশ্বাস, নানান কমিটি করে মিডিয়ার সামনে আইওয়াশ করতেন তৎকালীন সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এখনো তার ধারাবাহিকতার রিহার্সাল চলছে।
যাতায়াতের ক্ষেত্রে মানুষের সংকটকে পুঁজি করে বিগত ১৫ বছরে দেশের সড়ক যোগাযোগে উন্নয়নের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নেওয়া হয়েছে একের পর এক মেগা প্রকল্প। খরচ করা হয়েছে বেহিসেবি অর্থ। এসব প্রকল্পের অনেক ক্ষেত্রে এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশের তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি খরচের নামে লুটপাটে ব্যস্ত ছিল তৎকালীন সরকার। অন্যদিকে, সড়কে কেবলমাত্র মালিক-শ্রমিক নেতাদের তোষামোদ করা, তাদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ক্ষেত্রে উদার হলেও জনস্বার্থ বা যাত্রীস্বার্থ বরাবরই উপেক্ষিত ছিল।
ফলে প্রতিদিনের যাতায়াতে দেশের সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করলেও এসব লাঘবে সরকারের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ ছিল না। মন্ত্রী ছিলেন গলাবাজিতে ব্যস্ত। প্রতিবার নতুন করে ক্ষমতা দখল করে পরিবহন সেক্টরে রাতারাতি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়াই ছিল যেন মন্ত্রীর কাজ।
বিগত ১৬ বছরে পরিবহন সেক্টরে এমন হাজার হাজার প্রতিশ্রুতি আমরা পেয়েছি। বড় বড় প্রাণহানির পর নানান বিষয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি কেউ কেউ সুপারিশও দিয়েছেন। এ ধরনের হাজারো সুপারিশমালা মন্ত্রণালয়ে ডিপ ফ্রিজে নিদ্রামগ্ন।
পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদি একজন মন্ত্রী হিসেবে এই সেক্টরকে তার নীতিনির্ধারণী জ্ঞান দিয়ে পরিবর্তন করা, অথবা উন্নত বিশ্ব ভ্রমণ করে লব্ধ জ্ঞান দেশের পরিবহন সেক্টরে ব্যবহার করে পরিবর্তন আনা— কোনো কিছুই তার মধ্যে ছিল না।
অন্যদিকে, আমলানির্ভর করে পরিবহন সেক্টর পরিচালনা করা হচ্ছে। এখানে কারিগরি জ্ঞানের প্রাধান্য না দেওয়ায় সমস্যা দিন দিন কেবল জটিল হচ্ছে। পৃথিবীর দেশে দেশে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে পরিবহন সেক্টর পরিচালনা করা হয়, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সড়ক নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে সেখানে সড়ক দুর্ঘটনা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। সড়ক থাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে, আর আমাদের দেশে সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৮ সালে প্রণীত সড়ক পরিবহন আইনে যাত্রী ও নাগরিক সমাজের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। কোনো দাবি-দাওয়া তথা নাগরিক অধিকার বা সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে পরিবহনে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, ভাড়া নৈরাজ্য, যাত্রী হয়রানি ও সড়ক দুর্ঘটনা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে যে নতুন আইন প্রণয়ন করা হলো, সেই আইন বাস্তবায়নের সাত বছর পরও মানুষের ভোগান্তি, হয়রানি ও সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা না কমে উল্টো বহুগুণে বেড়েই চলেছে।
বাসে বাসে ভয়ংকর প্রতিযোগিতা চলছে, সিটিং সার্ভিসের নামে এখনো ভাড়া নৈরাজ্য চলছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বাঁকগুলোতে এলোমেলোভাবে বাসের যাত্রী তোলার অসম প্রতিযোগিতার কারণে যানজট ও জনজটের ভোগান্তিতে নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ।
ফলে নগরজীবনের এহেন দুর্বিষহ যাতায়াতের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে ব্যয়বহুল মোটরসাইকেল রাইডশেয়ারিং, ইজিবাইক, অটোরিকশার মতো ছোট ছোট যানবাহন এখন রাজধানীসহ দেশের শহরগুলোর প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে। ফলে যানজটে অতিষ্ঠ এখন নগরজীবন। ৫৬ শতাংশ মানুষ বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পরিবহন ব্যবহার করছে।
পরিবহনে দুর্নীতি ও ভুলনীতির ফলে যানজট এখন নগর, বন্দর পেরিয়ে গ্রামগঞ্জেও সম্প্রসারিত হচ্ছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যাত্রী অধিকার দিবস–২০২৫ উপলক্ষে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এহেন চরম ভোগান্তি থেকে দেশের মানুষকে মুক্তি দিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহের কাছে রাজনৈতিক অঙ্গীকার কী হবে, তা তাদের দলের স্ব স্ব নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটি।
লেখক: মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী, মহাসচিব, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
মন্তব্য করুন