শুক্রবার
২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানবাধিকার পরিস্থিতি, প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

কামরুল হাসান দর্পণ
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৫:৩০ পিএম আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০২:১৭ পিএম
expand
মানবাধিকার পরিস্থিতি, প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বিগত দেড় দশকের অধিক সময় ধরে স্বৈরাচারী শাসনামলে দেশে মানবাধিকার বলে কিছু ছিল না। সবকিছুই ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণে।

সরকারের কথার বাইরে কোনো কিছু বলা যেত না। কথা বলার স্বাধীনতা, সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতি, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সচেতন মহল তো বটেই—সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ কোনো মাধ্যমেই এ নিয়ে কথা বলা অত্যন্ত দুরূহ ছিল।

অবশ্য এসব মিডিয়ার বেশিরভাগই ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং এগুলোতে কর্মরতরা সরকারের গুণকীর্তন ও তেলবাজিতে জড়িয়ে ছিল। তারা সরকারের তথাকথিত উন্নয়নের ফানুস উড়িয়ে জয়গান গাইত।

যে দু-একটি পত্রপত্রিকা ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম প্রকৃত চিত্র তুলে ধরত, তাদের ওপর নেমে আসত কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়্গ। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকসহ সম্পাদকের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা ও জেল-জুলুম হয়েছে। এমনকি হত্যারও শিকার হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব মতে, শেখ হাসিনার দেড় দশকে প্রায় ১৫ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছে। এদের বেশিরভাগই সরকারি দলের নেতাকর্মীদের অনিয়ম, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় হত্যার শিকার হয়।

জুলাই গণআন্দোলনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ৫ জনের মতো। দেড় দশকের শেখ হাসিনার শাসনামলে ভিন্নমতের পত্রপত্রিকা, অনলাইন মিডিয়াসহ বেশ কয়েকটি টেলিভিশন মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের মুখপাত্র হয়ে সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপশাসনের খবর প্রকাশ করা অসম্ভব ছিল। মুখ বন্ধ করে রাখতে হতো।

ভিন্নমত বা প্রকৃত সংবাদ মানুষের সামনে তুলে ধরার অভিপ্রায়ে যেসব সংবাদমাধ্যম চালু ছিল, তারা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ‘সেল্ফ সেন্সরশিপে’ চলে গিয়েছিল। তাতেও যে সরকারের রোষ থেকে নিস্তার মিলত তা নয়, পরোক্ষ হুমকি-ধমকি দেওয়া ছিল নিত্যকার বিষয়।

টেলিভিশন টকশোগুলোতে যেসব সচেতন সাংবাদিক ও ব্যক্তিত্ব সরকারের সমালোচনা করতেন, তাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন মিডিয়ার প্রকৃত তথ্য নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেওয়ার অর্থই হচ্ছে মানুষের মুখ বন্ধ করে দেওয়া। অন্যদিকে, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল যারা জনগণের দাবি ও সরকারের বিভিন্ন অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলবে, সেটাও ছিল সংকুচিত। বিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক যে অধিকার, তা এতটাই সংকুচিত করে দেওয়া হয়েছিল যে, তাদের সভা-সমাবেশ, এমনকি সাধারণ একটি মানববন্ধনও করতে দেওয়া হতো না।

সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ইত্যাদি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে গেলেই দলীয় বাহিনীতে পরিণত হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলে পড়ত। খুন, গুম, নিপীড়ন, নির্যাতন, হামলা-মামলা, জেল-জুলুম, বাড়িঘর ছাড়া করাসহ হেন কোনো দমন-পীড়ন নেই, যা করা হয়নি। কত পরিবার যে ধ্বংস হয়ে গেছে, তার যথাযথ হিসাব পাওয়া মুশকিল। আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের গুম হওয়া পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে কীভাবে রাস্তায় নেমে বাবা, ভাইয়ের সন্ধান দেওয়ার জন্য আহাজারি করেছে। এখনো করছে।

অর্থাৎ দেড় দশক ধরে স্বৈরাচারী সরকার দেশে ‘ভয়ের অপসংস্কৃতি’ তৈরি করে মানুষকে দমন করে তার শাসন টিকিয়ে রেখেছিল। মানবাধিকার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যে প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করত, তা সরকারের তরফ থেকে প্রত্যাখ্যান করে উল্টো তাদেরকে গালিগালাজ করে ধুয়ে দিত।

বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল, আমাদের দেশের তথাকথিত সুশীলরা এসব দেখেও চুপ থাকত। উল্টো সরকারের গুণগান গেয়ে দেশের অমানবিক পরিস্থিতিকে জায়েজ করে দিত।

বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট রেজিমে মানবাধিকার পরিস্থিতি কী ছিল, তা বোধ করি সকলেরই জানা। এখানে উপস্থিত সম্মানিত অতিথিরাও তা জানেন। উল্লেখিত পরিস্থিতির মুখোমুখি তারাও হয়েছেন। দেশের ইতিহাসে কোনো সরকারের সময়ে নৃশংস মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যে গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানে হয়েছে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। একটি সরকার শুধু ক্ষমতায় থাকতে আন্দোলন দমাতে কীভাবে তার পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ে গণহত্যা চালিয়েছে, তা আমরা দেখেছি।

ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে নারী, শিশু, হকার, টোকাইসহ সব শ্রেণীর মানুষ এ হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে। জাতিসংঘের তদন্ত দলের হিসাবে প্রায় ১৪০০ মানুষ হত্যার শিকার হয়েছে। চিরতরে অন্ধ ও পঙ্গু হয়েছে হাজার হাজার। পত্রপত্রিকার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩০ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা চিরতরে অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে গেছে।

সহস্র প্রাণের বিনিময়ে আমরা যে দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিস্ট রেজিম থেকে মুক্ত হয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার পেয়েছি, দেশকে কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছি, কোন পরিস্থিতিতে এ যাত্রা শুরু হয়েছে এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি কী, তা বিচারের দাবি রাখে।

বুঝতে অসুবিধা হয় না, এখন মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলো রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করছে। আমরা জানি, একটি ভয়ংকর শাসন ব্যবস্থার পতনের পর ফ্যাসিস্টদের ভেঙে দেওয়া রাষ্ট্র কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার যাত্রা শুরু করে।

আমরা এটাও দেখেছি, গণঅভ্যুত্থানে পতিতদের দোসররা সরকারের যাত্রার শুরুতেই ফেলে দেওয়ার জন্য কীভাবে একের পর এক ষড়যন্ত্র করেছে। ছাত্র-জনতা ও ফ্যাসিবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেসব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ধীরে ধীরে তার পায়ের নিচে মাটি পায়।

বলার অপেক্ষা রাখে না, দেড় দশক ধরে ধ্বংস করে দেওয়া রাষ্ট্র কাঠামো রাতারাতি পুনর্গঠন অত্যন্ত কঠিন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এ কাজটি যথাসাধ্যভাবে করে যাচ্ছে। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং শান্তি-শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে তাকে যাত্রা শুরু করতে হয়েছে ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে। একটি পুরো বাহিনী যদি অচল হয়ে যায়, তাহলে তা পুনর্গঠন করে সচল করতে সময়ের প্রয়োজন। তারপরও সরকার আন্তরিকতার সাথে কাজ করে এ বাহিনীকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে সরকারকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনীকে মাঠ পর্যায়ে রেখেছে।

এর মধ্যেও যে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে না, তা বলা যায় না। বাস্তবতা হচ্ছে, দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতনের পর যেভাবে তার ওপর জনরোষের বিস্ফোরণ হওয়ার কথা, তার তেমন কিছুই হয়নি। আমরা দেখেছি, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রায়ই বলতেন, সরকারের পতন হলে এক রাতেই আওয়ামী লীগের দশ লাখ লোক মারা যাবে। গণঅভ্যুত্থানের তার সরকারের পতনের পর এর কিছুই হয়নি। এটা সম্ভব হয়েছে, ফ্যাসিবিরোধী ছাত্র-জনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ঐক্যের কারণে।

এখন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কী তা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। আগেই বলেছি, একটি ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতনের পর ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাষ্ট্র কাঠামো রাতারাতি মেরামত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তবে এটা বোঝা যাচ্ছে, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আগের মতো ভয়াবহ অবস্থায় নেই। যদিও ‘মব জাস্টিস’ নামে বেশ কিছু ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। কিছু নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর সাথে এক শ্রেণীর অতি উৎসাহী, স্বার্থান্বেষী ও সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী জড়িত। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তবে সরকার এসব ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় এর পুনরাবৃত্তি কিছুটা কমেছে। চাঁদাবাজি, অবৈধ দখল ইত্যাদি এখনো বহাল রয়েছে। এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পেরেছে বলে প্রতীয়মান হয় না।

মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতিকরণে, ফ্যাসিস্ট আমলের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, হয়রানিমূলক ঘটনা, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর বিধিনিষেধ, সাংবাদিকদের অযৌক্তিকভাবে গ্রেপ্তার বা বিচার, সেন্সরশিপের মতো ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বরং ফ্যাসিস্ট সরকারের দেড় দশক ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িতদের বিচার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে কাজে লাগানো হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে যেসব গণমামলা হয়েছে এবং যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদেরকে তদন্তের আগে গ্রেপ্তার না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মানবাধিকারকে এগিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে।

সরকারের উচিত হবে, বিগত দেড় দশক ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের যারা ক্রমাগত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখিয়ে বিচার করে যাওয়া, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকার বা গোষ্ঠী মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিন্তা করতে না পারে। মানবাধিকার পরিস্থিতির বাস্তব ও স্থায়ী পরিবর্তন আনতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

যে রাজনৈতিক দলগুলো অতীতে নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তাদেরও মানবাধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে, যাতে আর কখনো অতীতের পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং সকলের অধিকার রক্ষা নিশ্চিত হয়।

১৬ আগস্ট ২০২৫ জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপিত।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন