


একটা স্বাধীন দেশের জন্য রাজনীতি চর্চা অপরিহার্য। কারণ রাজনীতি চর্চা না থাকলে একটা জাতি না স্বাধীন হয়, না সমহিমায় আবির্ভূত হতে পারে, না ওই জনপদের লোকজন স্বীয় পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। উঁচু ব্যবসা আর বড় চাকরি পাবার জন্য স্বাধীনতার প্রয়োজন হয় না।
চাকরি বা ব্যবসা যেকোনো সময় যেকোন শাসকের অধীনে সম্ভব। গোলাম হলেও অর্থবিত্তের মালিক হওয়া যায়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন জিনিস। এ পরিচয় অনেক বড়। এই পরিচয় থাকলে স্বাধীন দেশের নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের স্বকীয়তা, অনমনীয় ও মর্যাদাপূর্ণ মানসিকতা তৈরি হয়।
চেতনাদীপ্ত মানুষরা নিজ ভূমিতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে চায়। কারণ দেশ ও দেশের মানুষ নিয়ে পরিকল্পনা থাকে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীন ভূমি অপরিহার্য। স্বাধীন ভূমির সাথে দরকার কতগুলো অসম সাহসী মানুষের। স্বাধীন ভূমির সাথে অসম সাহসী কতক মানুষ যুক্ত হলেই তৈরি হয় ভিন্ন রকম নেতৃত্ব। তার জন্য রাজনীতি, রাজনৈতিক দল এবং সুনির্দিষ্ট কমিটমেন্ট অপরিহার্য।
আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষ ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। স্বাধীন ভূমি ছিল না, তিনি সেই ভূমির ব্যবস্থা করে যান। আমাদের আত্মপরিচয় ছিল না, তিনি পরিচয় দিয়ে যান। আমাদের এগুনোর সাহস ছিল না, তিনি আমাদের সাহসী হতে উদ্বুদ্ধ করেন।
আজ আমরা স্বাধীন দেশের মানুষ। আমাদের পূর্ব পুরুষরা যুদ্ধ করে আমাদের স্বাধীন ভূমির ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছেন। এখন আমাদের প্রয়োজন নিজেদের জাগ্রত রাখা, স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখা, মানুষকে সচেতন করে তোলা এবং সকলকে সংঘবদ্ধ করে সাফল্যের দিকে ধাবিত করা।
আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমান বলেছেন মহল্লায় যদি ডেঙ্গু মশা থাকে সে আপনাকেও কামড়াতে পারে, আমাকেও। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থেকে বাঁচতে হলে এলাকা থেকে ডেঙ্গু তাড়াতে হবে। যদি ভাবেন ডেঙ্গু মশা আপনাকে কামড়াবে না, বস্তির মানুষকে কামড়াবে। কারণ বস্তির মানুষ নোংরা পরিবেশে থাকে। আপনি থাকেন সুরক্ষিত ভবনে।
যদি ভাবেন বস্তির মানুষকে কামড়ালে আমার কি! আপনি নিশ্চিত থাকুন মশা কিন্তু আপনাকেই কামড়াবে। কারণ এর আগে যখন ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল তখন কিন্তু ডেঙ্গু মশা অভিজাত লোকদেরই বেশি কামড়িয়েছে।
এখন আমাদের কাজ কি? আমাদের কাজ হল মশার অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য ডেঙ্গু মশা মেরে ফেলা। তাহলে আপনিও সেইভ, আমিও সেইভ। একইভাবে সমাজ থেকে সমস্যা দূর করতে পারলে আপনিও নিরাপদ আমিও নিরাপদ। আমাদের দেশের সকল মানুষ নিরাপদ। প্রয়োজন অন্যায় অবিচার অনৈতিক কর্মকান্ড এবং দুর্নীতি বন্ধ করা।
বিএনপি এজন্য বলে মানুষকে নিয়েই তাদের রাজনীতি। তারা সবার আগে মানুষের স্বার্থ দেখে। তারা ভিন্ন গ্রহ থেকে আসা বিশেষ কোন গোষ্ঠী নয়। বর্গী ডাকাতদের মত বহিরাগতও নয়। আপনি আমি আমাদের নিয়েই বিএনপি। এখানে গ্রামের চাষী, ক্ষেতের মজুর, বস্তির আশ্রয়হীন মানুষ থেকে শুরু করে অভিজাত অট্টালিকার বাসিন্দারাও এর সদস্য। সবাই একটা পরিবারের মানুষ। প্রত্যেকেই একটা করে ভোটের মালিক, একই মর্যাদার দাবিদার।
বিএনপির জনতার সেই দাবির কথাই আপনাদের বলতে এসেছে। দাবি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে এসেছে। বিএনপি দিতে এসেছে। আপনাকে আপনার সীমিত সামর্থ দিয়ে স্বাবলম্বী করে দিতে চায়। সুযোগ দিতে চায়, কর্ম করে খাবার পরিবেশ দিতে চায়। দান অনুদান দিয়ে কৃতজ্ঞতার বশে আবদ্ধ করতে চায় না। বিএনপি বলে নেতার আগে জনতা। আমির আগে আমরা। আমাদের আগে দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ।
দেশের মানুষ রাজনীতি করবে না, স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করবে না, এমন কথা ছিল না। তারা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে মাথা উঁচু করে চলার জন্য, নিচু করে থাকার জন্য নয়।
কিন্তু একটা অন্ধকার যুগ চলে আসার পর, মুরগিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রাজনীতি চলে গিয়েছিল দুর্বৃত্ত লুটেরা সন্ত্রাসীদের হাতে। ফলে সমাজের মর্যাদাবান লোকরা ধীরে ধীরে রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়ে। তারা ধরেই নিয়েছিল রাজনীতি তাদের কারবার নয়। রাজনীতির অঙ্গন ঘৃণিত নিন্দিত অঙ্গন তাদের জন্য না।
রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েই তারা ক্ষান্ত থাকেনি, তাদের উত্তরাধিকারদেরও নিরুৎসাহিত করতে থাকে যাতে তারা এই বস্তাপচা জিনিসে না জড়ায়। অথচ রাজনীতি ছিল শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত সম্মানিত লোকের কারবার। যারা আত্মত্যাগ করতে জানে, প্রয়োজনে ঝুঁকি নিতে জানে এবং মানুষকে সঠিক পথে চালিত করতে পারে।
অথচ রাজনীতি লুটেরা বরকিদের হাতে চলে গেলে, এর ব্যাড কালচার প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনীতি এমন কুৎসিত লোকদের করতলে চলে যায় যাদের সাথে হাতে হাত রেখে, পায়ে পা মিলিয়ে চলা দুষ্কর ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ বিরূপ ও বিষদৃশ অবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন এলো যখন আমাদের নেতা তারেক রহমান স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন। যেদিন তিনি এলেন সেদিন কোটি মানুষ তার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রমাণ করল এতদিন তারা কিভাবে তার অপেক্ষায় ছিল। সহস্র যাতনার মধ্যেও কিভাবে তারা তার জন্য প্রহর গুনেছে।
তার আগমনে মানুষের জাগরণ কেমন হবে তার বর্ণনা দিতে গিয়ে কেউ বলছিলেন তার আগমন জলোচ্ছ্বাসের মত হবে, কেউ বলেছিল সুনামির মত হবে, কেউ বলেছিল ভূমিকম্পের মত হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মহাপ্রলয় হয়ে গেল। সারা দেশের প্রতিটি গ্রামে গঞ্জে, নগরে বন্দরে তার আগমন বার্তা ছড়িয়ে পড়লো এবং দিকে দিকে মানুষ জেগে উঠলো।
অবস্থাটা এই : তারা সরব-নিরব ভাষায় জানান দিল- তিনি এসে গেছেন। তিনিই নেতৃত্ব দিবেন। আমরা সবাই তার নেতৃত্ব মেনে নিব। কার্যত তা-ই হলো। বাংলাদেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম, রূপসা থেকে পাথুরিয়া, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া শহর বন্দর, গ্রাম গঞ্জ, নগর মহানগর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে তারেক রহমানের উচ্ছ্বাস উন্মাদনা। কলরোল ছড়িয়ে পড়লো সবখানে।
তিনি যেখানে যাচ্ছেন, যে পথ দিয়ে যাচ্ছেন, এক পলক দেখার জন্য সেই যে মানুষের কি আগ্রহ! তার প্রতি মানুষের এত যে ভালোবাসা! এমন উপচে পড়া ভিড়, জনসমাবেশ জনসমুদ্র, এতে একটা জিনিস প্রমাণিত হয়, দেশের মানুষ, চাই তারা দীন-দরিদ্র, সুশীল কুলীন, শিক্ষিত শিক্ষাহীন, সবাই তাকে ভোট দিবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
খুব সম্প্রতি বনানী গুলশান এলাকায় একটি নির্বাচনী মিছিল বের হয়েছিল ঢাকা ১৭ এর প্রার্থী জনাব তারেক রহমানের পক্ষে। আমরা দেখলাম মিছিল যত এগুচ্ছে মিছেলে অংশ নেয়া লোকের সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিছিলে যে পরিমাণ সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছে তার চেয়ে অভিজাত শিক্ষিত বিদ্যবান নারী-পুরুষ বেশি অংশ নিয়েছে।
জিজ্ঞেস করে জানলাম তাদের কেউ ডেকে আনেনি। তারা নিজেরাই নিজেদের আগ্রহে অংশ নিয়েছেন। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়েছে, শিক্ষিত মার্জিত রুচিবান উন্নত মানুষরা আবার ফিরে এসেছে রাজনীতির অঙ্গনে।
এর আগে এক রাতে বনানী ক্লাব মাঠে ১১ টি ক্লাব এবং সোসাইটির সভ্যরা সমবেত হয়েছিল। সেখানে নারী-পুরুষ, তরুণ তরুণী নির্বিশেষে সবাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাজির হয়েছিল।
সেই নির্বাচনী মিটিংয়ে তারেক রহমানের সাথে তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে তারা সবাই নিসঙ্কোচে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। শেষে সন্তুষ্ট হয়ে কথা দিয়েছেন, তারা তারেক রহমানের পাশে থাকবেন।
এ দুটো ঘটনা দেখে আমরা বুঝে নিয়েছি রাজনীতিকে যতই নোংরা করা হোক, রাজনীতির ভাষাকে যতই কদর্য করা হোক, আচরণকে যত বর্গীকরণ করা হোক, যতই উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বৃত্তায়ন করা হোক, এক ঝটকায় রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় ফিরে এসেছে।
এটি এখন আর নষ্ট লোকের নষ্টামির জায়গা নয়, পরিচয়হীন বাইদার পোলার কর্তৃত্বে জায়গা নয়। বরং এটি এখন উদার উন্নত শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মানুষের আশ্রয়স্থল।
পরশ পাথরের ছোঁয়ায় লোহাও যেমন সোনা হয়ে যায়, তেমনি তারেক রহমানের আলোয় দেশের মানুষ উদ্ভাসিত সারা দেশ আলোকিত আলোড়িত। তারেক রহমান তার নিজের কর্মগুণেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সমহিমায় ভাস্বর।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মন্তব্য করুন