শুক্রবার
২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণভোট কী, আগে যেমন ছিল ?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:১২ পিএম আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:১৭ পিএম
গণভোট কী , আগে যেমন ছিল
expand
গণভোট কী , আগে যেমন ছিল

গণভোট হলো এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বা স্থানীয় ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব জনগণের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সংসদ বা সরকারের পরিবর্তে নাগরিকরাই সরাসরি ভোট দিয়ে জানান, তারা প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তের পক্ষে নাকি বিপক্ষে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংবিধান পরিবর্তন, প্রশাসনিক কাঠামো সংশোধন, বা গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত ব্রেক্সিট গণভোটে জনগণ ভোটের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না-থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।

বাংলাদেশের সংবিধানেও গণভোটের বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো বা সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও এ প্রক্রিয়া দেশে খুব কম ব্যবহৃত হয়েছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, গণভোট হলো জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি।

এবার চলুন জেনে আসি বাংলাদেশের গণভোটের ইতিহাস.....

বাংলাদেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকাজের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য। ভোটের মাধ্যমে দেশের জনগণ জানান, রাষ্ট্রপতি এবং তার নীতি ও কর্মসূচির প্রতি তারা আস্থা রাখেন কি না।

সরকারি ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় ৯৮.৮৭ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। তবে ভোটের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে পরবর্তীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল গণভোটের ঘোষণা দেন জিয়াউর রহমান। দেশের ২১ হাজার ৬৮৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তখন দেশের মোট ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৪ লাখ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে।

এই গণভোটের উদ্দেশ্য ছিল এরশাদের নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ও সমর্থন যাচাই করা। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠা এবং সামরিক শাসনের পর গণসমর্থন প্রদর্শন ছিল এর মূল লক্ষ্য।

সরকারি ফলাফলে দেখা যায়, প্রায় ৯৪.৫ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। তবে ভোটের সঠিকতা, অংশগ্রহণের হার এবং ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চের এই গণভোট ছিল বাংলাদেশের সামরিক শাসনকালীন রাজনীতিতে জনগণের সমর্থন যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা, যা পরবর্তীতে এরশাদের রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি (জাপা) গঠনের পথ সুগম করে।

গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরপর পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে বিল পাস হয়।

সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।

ভোটে অংশগ্রহণের হার ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোটার 'হ্যাঁ' ভোট দিয়ে সংসদীয় প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ ভোটার 'না' ভোট দেন।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের অংশ হিসেবে এবার গণভোটের প্রস্তাব সামনে এনেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।

মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশনের পক্ষ থেকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের সুপারিশমালা হস্তান্তর করা হয়। কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজন করা হবে।

খসড়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার বিষয়ক প্রস্তাব গণভোটে জনগণের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা সরাসরি প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হবে।

গণভোটের ব্যালটে থাকবে একটি প্রশ্ন—

“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং এর তফসিল-১ এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”

ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে নিজেদের মতামত জানাবেন।

তফসিল-১ এ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সংবিধানের ৪৮টি সংশোধন প্রস্তাব, যা কমিশনের আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। যদিও ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে বিভিন্ন দলের ভিন্নমত সংযোজিত ছিল, চূড়ান্ত খসড়ায় সেগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

গণভোটে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। এই পরিষদ সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ (Constituent Power) প্রয়োগের অধিকার পাবে।

পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর পর থেকে ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে, গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।

খসড়া আদেশে বলা হয়েছে, গণভোটটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অথবা নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।

ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত আদেশে গণভোটের পদ্ধতি, পরিষদের গঠন ও কার্যাবলি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া পরিষদ সদস্যদের জন্য পৃথক শপথবাক্যও নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আদেশের দ্বিতীয় তফসিলে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন