

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আজ রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে রাখাইন রাজ্য থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। দেখতে দেখতে এই ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয়ের ৯ বছর পার হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রতিবছর ২৫ আগস্টকে 'রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস' হিসেবে পালন করে আসলেও, এতগুলো বছরেও নিজেদের মাতৃভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো সুসংহত সমাধান পাননি তারা।
বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও ভাসানচরের বিভিন্ন ক্যাম্পে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিলেও, বিপুল এই জনসংখ্যার দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
সহায়তার আন্তর্জাতিক তহবিল দিনে দিনে হ্রাস পাওয়ায় ক্যাম্পগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারের ঘাটতি প্রকট হচ্ছে। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
পূর্বে আন্তর্জাতিক চাপ মূলত মায়ানমার সামরিক জান্তার ওপর ছিল। কিন্তু বর্তমানে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী 'আরাকান আর্মি' (Arakan Army)-র হাতে। ফলে সামরিক জান্তা সরকারের সাথে কথা বলে রোহিঙ্গা ফেরানো এখন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ রাখাইনে তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। আরাকান আর্মির সাথে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অবিশ্বাসের কারণে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ-মায়ানমার পাইলট প্রকল্প থমকে থাকা
চীন ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে যাচাই-বাছাই করে মায়ানমারে ফেরত পাঠানোর একটি 'পাইলট প্রকল্প' শুরু করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রধান দাবি- নাগরিকত্ব, নিজেদের ভিটেমাটিতে ফেরা এবং পূর্ণ নিরাপত্তা- মায়ানমার নিশ্চিত না করায় এবং রাখাইনে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় এই প্রচেষ্টা চূড়ান্ত রূপ নেয়নি।
আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়া (ICJ ও ICC)
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) মায়ানমারের বিরুদ্ধে রুজু হওয়া গণহত্যার মামলার শুনানি চলছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও (ICC) মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলছে।
আন্তর্জাতিক চাপ বজায় থাকলেও এই বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারছে না।
সহায়তার তহবিল সংকট
বিশ্বজুড়ে অন্যান্য নতুন যুদ্ধ ও সংকটের (যেমন ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য) কারণে রোহিঙ্গা তহবিলে আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে অনুদান দিন দিন কমছে। এর ফলে কক্সবাজার ও ভাসানচরের ক্যাম্পগুলোতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) খাদ্য বরাদ্দ কমাতে বাধ্য হয়েছে, যা রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।
নিরাপত্তার হুমকি ও অনুপ্রবেশ
রাখাইনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় সীমান্ত দিয়ে এখনো ছোটখাটো রোহিঙ্গা গোষ্ঠী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে ক্যাম্পগুলোর ভেতরে আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত জটিল হচ্ছে।
কূটনৈতিক আলোচনা খাতাপত্রে চালু থাকলেও রাখাইনে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার অভাব, মায়ানমার সরকারের অনাগ্রহ এবং অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাস্তবে কোনো আলোর মুখ দেখছে না।
মিয়ানমারে অব্যাহত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সামরিক জান্তার অনাগ্রহ এবং পরবর্তীতে দেশটির অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাতের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।
যদিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে, তবে বাস্তবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব, নিরাপদ বাসস্থান এবং মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা এখনো বহুদূর।
রোহিঙ্গারা কেবল ত্রাণ বা স্থায়ী শরণার্থী জীবন চান না, তারা চান নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার। এই সংকট সমাধান কেবল বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়।
বিশ্ব সম্প্রদায়কে কেবল বার্ষিক শোক প্রকাশ বা গুটিকয়েক প্রস্তাবে সীমাবদ্ধ না থেকে, মিয়ানমারের ওপর কার্যকর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। অন্যথায় এই অনির্দিষ্টকালের বন্দিদশা কেবল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে না, পুরো অঞ্চলের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেও মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।


