শুক্রবার
২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আওয়ামী লীগের দোসরকে এপিডি করতে জামায়াতপন্থিদের তদবির

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০১:৫৫ পিএম আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০২:৩২ পিএম
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের লোগো
expand
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের লোগো

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারকে প্রশাসন দলীয়করণের একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরিতে ‘জনপ্রশাসন পদক’ প্রবর্তনের সাথে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগের (এপিডি) বসাতে জামায়াতপন্থি কর্মকর্তাদের তবদির শুরু হয়েছে।

গত সপ্তাহে এ পদে এক কর্মকর্তাকে সরকার নিয়োগ দিলেও তাকে পদায়ন করা হচ্ছে না। উল্টা দিকে এক উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিলে আওয়ামী লীগের দোসর এক আমলাকে দায়িত্ব দেয়ার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে সুপারিশ করেছেন।

এ ঘটনায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। ৫ আগস্টের পর জনপ্রশাসন থেকে সরিয়ে জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা মো. এরফানুল হককে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগের (এপিডি) করা হয়।

গত ১৪ মাসে প্রশাসনে বদলি-পদায়ন এবং পদোন্নতি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে প্রথমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে বদলি করা হয়। এপিডি অতিরিক্ত সচিব মো. এরফানুল হককে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে বদলি করা হয়েছে। তবে বদলি করা হলেও তিনি এখনো দায়িত্ব ছেড়ে দেননি।

অন্যদিকে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সেন্ট্রাল পার্সোনেল অ্যান্ড ট্রেনিং (সিপিটি) উইংয়ের প্রধান ড. আবু শাহীন মো. আসাদুজ্জামানকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে প্রশাসনে। সম্প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও বদলির ঘটনায় তাঁর প্রভাব ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কর্মকর্তাদের একটি অংশ অভিযোগ তুলেছেন জনপ্রশাসনের নিয়োগ, বদলি ও প্রশাসনিক পদায়নে তিনি ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক যোগসূত্র কাজে লাগাচ্ছেন। ড. আসাদুজ্জামান ১৮তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।

বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সব স্তরে নিয়মিত পদোন্নতি পেতে পেতে অতিরিক্ত সচিব হন।

গাইবান্ধা জেলার এই কর্মকর্তার রাজনৈতিক অতীত নিয়েও প্রশাসনে রয়েছে আলোচনা। এক সময় তিনি ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে কয়েকজন সাবেক সহকর্মী দাবি করেছেন।

আর তার শ্বশুর আওয়ামী লীগ নেতা হবার সুবাদে সুকৌশলে তিনি ঘনিষ্ঠ হন আওয়ামী ঘরানার প্রভাবশালী আমলাদের সাথে। তাছাড়াও তাঁর শ্বশুর ছিলেন বিগত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলের একজন আলোচিত ও বিতর্কিত সাবেক এমপি। সেই রাজনৈতিক ছায়াতেই তিনি প্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়নে একাধিক সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর তাঁকে এই মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রশাসনেরই আরেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও এপিডি’র দায়িত্বে থাকা এরফানের মাধ্যমে কিছুদিন আগে তিনি আবারও জনপ্রশাসনে ফিরে আসেন।

তাঁর ঘনিষ্ঠদের ভাষায়, ড. আসাদুজ্জামানের মূল লক্ষ্য এখন জনপ্রশাসনে এপিডি উইংয়ের প্রধান হওয়া। প্রশাসনে ‘দলীয় আনুগত্য’ ও কৌশলী সম্পর্ক গড়ে তুলেই তিনি সেই পথে এগোচ্ছেন।

অতীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে প্রশাসন দলীয়করণের একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরির বিষয়ে তিনি ‘জনপ্রশাসন পদক’ প্রবর্তনের পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সাবেক কৃষি সচিব কৃষিবিদ মেজবাহুল ইসলাম তাঁর ভায়রা ভাই, যিনি আওয়ামী আমলে প্রভাবশালী সচিব হিসেবে পরিচিত। তাঁর আরেক ভায়রা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি’র পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত ২১ সেপ্টেম্বর সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মোখলেস উর রহমান অবসরে যাওয়ার পর রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিতর্ক তৈরি হয়। নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অতিরিক্ত সচিবকে।

কিন্তু নিয়ম ভেঙে দায়িত্ব দেওয়া হয় অধিকতর জুনিয়র ও একটি বিশেষ দলের অনুগত হিসেবে পরিচিত ড. আসাদুজ্জামানকে। তার লাইনঘাট এতটাই শক্তিশালী যে মোখলেসুর রহমানকে জনপ্রশাসন থেকে সরানোর পরে তিনি রুটিন সচিবের দায়িত্ব নেন, যদিও হওয়ার কথা ছিল মন্ত্রণালয়ের রেগুলার এডিশনাল সেক্রেটারির।

মোখলেস-উত্তর জনপ্রশাসনের পদ পদায়নে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে চারজন ডিসি নিয়োগ, প্রাথমিক অধিদপ্তরে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে টাকার বিনিময় বা ফ‍্যাসিস্ট পূণর্বাসন কমিটমেন্ট রয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ছে।

এছাড়াও জনপ্রশাসন সচিবের রুটিন দায়িত্বকালে অসংখ্য কর্মকর্তা বদলি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডিসি নিয়োগ ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পদায়ন নিয়ে তার ভূমিকা সম্পর্কে নানান প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে- এসব নিয়োগে অর্থের বিনিময় বা দলীয় প্রতিশ্রুতি আদায়ের বিষয় জড়িত রয়েছে। সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের একটি অংশ বলছেন, তিনি সচিবের রুটিন দায়িত্বে থাকাকালে জনপ্রশাসনের পদায়ন প্রক্রিয়াকে একটি দলের স্বার্থে প্রভাবিত করেছেন। তার প্রভাব জনপ্রশাসনে পড়েছে।

সাবেক সচিব আব্দুল খালেক গণমাধ্যমকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বদলি ও নিয়োগে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এর পেছনে কারা কতটা প্রভাব রাখছেন, সেটি এখন তদন্ত সাপেক্ষ বিষয়। প্রশাসনের ভেতরে এখন নতুন প্রশ্ন ক্ষমতার ভারসাম্য ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়নের চর্চা কি আবারও একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবের ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে?

৫ আগস্টের পর তাকে জনপ্রশাসন থেকে সরানো হয়েছিল। সেই সব কর্মকর্তারা এখনো রয়েছেন। এটা সুদুরপ্রসারী লক্ষ‍্য। তিনি বলেন, সরকারের উচিত একজন নিরপেক্ষ কর্মকর্তাকে এপিডির দায়িত্ব দেয়া। ফ্যাসিস্ট কোনো কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হলে বিষয়টি ছাড় দেয়া হবে না।

এ বিষয়ে জানতে ড. আবু শাহীন মো. আসাদুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সব পদায়নই মন্ত্রণালয়ের নিয়ম ও নীতিমালার ভিত্তিতে করা হয়েছে। কারও প্রভাবে নয়, কাজ করেছি দায়িত্ব অনুযায়ী।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন