রবিবার
০২ আগস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
০২ আগস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নবম পে-স্কেলের আগে বেতন কেমন ছিল, বাড়ছে কত?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম
নবম জাতীয় পে-স্কেলে কার বেতন কত
expand
নবম জাতীয় পে-স্কেল। ছবি: সংগৃহীত

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বশেষ ২০২৫ সালের অষ্টম পে-স্কেল কার্যকর নিয়ে মোট আটটি জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়ে। এবার অপেক্ষা নবম জাতীয় পে-স্কেলের।

জাতীয় সংসদে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছেন।

নতুন পে-স্কেল আলোচনায় আসার পর থেকেই সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে কাদের বেতন কত বাড়ছে এ প্রসঙ্গে। এর পাশাপাশি স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কীভাবে বেড়েছে, সে হিসাবও সামনে এসেছে।

জাতীয় পে-স্কেল স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম ঘোষণা করা হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পাকিস্তান আমলের বেতন কাঠামো পরিবর্তন করে নতুন এই কাঠামো চালু করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় পে-স্কেলে মোট ১০টি প্রধান ধাপ বা গ্রেড (বেতন কাঠামো) ছিল। স্বাধীনতার পর তৎকালীন সরকারের গঠিত জাতীয় বেতন ও প্রশাসনিক কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রায় ২ হাজার ২০০টি পৃথক ক্যাটাগরির পদের বেতনকে এই ১০টি গ্রেডের মধ্যে বিন্যস্ত করা হয়েছিল। এই পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা। তবে এই বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

এর চার বছর পর ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয় জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়। এতে গ্রেডের সংখ্যা ১০ থেকে বাড়িয়ে ২১টি করা হয়। সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ২২৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ সর্বনিম্ন বেতন প্রায় ৭৩ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়।

তৃতীয় জাতীয় পে-স্কেল ১৯৮৫ সালের ১ জুন থেকে কার্যকর করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের আমলে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এই নতুন বেতন কাঠামো প্রবর্তন করা হয়। বাংলাদেশের সরকারি বেতন কাঠামোর ইতিহাসে শতকরা হিসেবে এই তৃতীয় পে-স্কেলেই সবচেয়ে বেশি হারে বেতন বাড়ানো হয়েছিল।

দ্বিতীয় পে-স্কেলের ২১টি গ্রেডকে কমিয়ে এই স্কেলে ২০টি গ্রেডে রূপান্তর করা হয়। বর্তমানের পে-স্কেলগুলোতেও এই ২০টি গ্রেডের কাঠামোই অনুসরণ করা হচ্ছে। এই স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডে ১২২.২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ মূল বেতন বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির রেকর্ড। এই স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২২৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ ও সর্বোচ্চ বেতন ৩ হাজার থেকে দ্বিগুণ করে ৬ হাজার টাকা করা হয়।

১৯৯১ সালে ঘোষিত চতুর্থ পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৯০০ টাকা করা হয়। আগের স্কেলের তুলনায় এতে সর্বনিম্ন বেতন ৮০ শতাংশ বাড়ে। সর্বোচ্চ মূল বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ১০ হাজার টাকা।

পঞ্চম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হয় ১৯৯৭ সালে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। সর্বোচ্চ মূল বেতন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ১৫ হাজার টাকা।

এরপর ২০০৫ সালে ষষ্ঠ জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ২৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। আগের স্কেলের তুলনায় সর্বনিম্ন বেতন ৬০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানো হয়।

২০০৯ সালে সপ্তম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৪ হাজার ১০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৪০ হাজার টাকা করা হয়। আগের স্কেলের তুলনায় সর্বনিম্ন বেতন প্রায় ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ বেতন প্রায় ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়ে।

সবশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ১০১ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ হাজার ২৫০ টাকা করা হয়। সর্বোচ্চ মূল বেতন ৯৫ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ৭৮ হাজার টাকা। এই স্কেলে আগের সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল ব্যবস্থা বাতিল করে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের নতুন কাঠামো চালু করা হয়।

এবার নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে আলোচনা চলছে। বেতন কমিশনের সুপারিশে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

সুপারিশ অনুযায়ী, বর্তমানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

অর্থাৎ কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে সর্বনিম্ন মূল বেতন বাড়বে ১১ হাজার ৭৫০ টাকা। আর সর্বোচ্চ মূল বেতন বাড়বে ৮২ হাজার টাকা। তবে কমিশনের সুপারিশই চূড়ান্ত বেতন কাঠামো নয়; সরকারের পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পরই চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ধারিত হবে।

বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বিদ্যমান কাঠামোয় সরকারের বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।

তবে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান। এ কারণে একবারে সব ধরনের বেতন-ভাতা কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর আগে নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারের পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।

স্বাধীনতার পর থেকে পে-স্কেলের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রথম জাতীয় পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ছিল ১৩০ টাকা। অষ্টম পে-স্কেলে এসে তা দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৫০ টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ দশকের বেশি সময়ে সর্বনিম্ন মূল বেতন কয়েক গুণ বেড়েছে। একই সময়ে সর্বোচ্চ মূল বেতন ২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৮ হাজার টাকা।

এখন নবম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটিই দেখার বিষয়। সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রজ্ঞাপন জারির পরই স্পষ্ট হবে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন শেষ পর্যন্ত কতটা বাড়ছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন