

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলতে পারে মার্কিন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের আসন্ন ঢাকা সফরে। তিন দিনের এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শুল্কনীতি, রোহিঙ্গা সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এসব বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সার্জিও গোরের সফরকে কেবল নিয়মিত কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নতুন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যোগাযোগের ধরন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ঢাকার অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত হিসেবে সার্জিও গোরের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি আরও শক্ত করা। অন্যদিকে, বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করবে। আলোচনায় থাকতে পারে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়।
সার্জিও গোরের সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি হতে পারে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি কৃষি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো ও সেবা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ সহজ করা, সম্ভাব্য শুল্ক সুবিধা, বাণিজ্য ভারসাম্য এবং মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে।
এ ছাড়া শ্রম অধিকার, কর্মপরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ রয়েছে। তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী খাতগুলোতে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ওষুধ শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর এবং ডিজিটাল সেবায় সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সার্জিও গোরের সফরের আরেকটি সংবেদনশীল বিষয় হতে পারে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর সরাসরি চীনবিরোধী অবস্থান নেওয়ার চাপ দিতে চাইবে—এমনটি মনে করার কারণ নেই। বরং ওয়াশিংটন জানতে চাইতে পারে, বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ কী ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অনুসরণ করছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সার্জিও গোরের সফরে রোহিঙ্গা সংকটও বড় জায়গা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সফরের অংশ হিসেবে তাঁর কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো, রাখাইনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়গুলো তুলে ধরা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সংকটে অন্যতম বড় মানবিক সহায়তাকারী দেশ। তবে বাংলাদেশের অবস্থান হলো, শুধু সহায়তা নয়, সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ দমন, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফর বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানো, অন্যদিকে চীন ও অন্যান্য প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখা—এই ভারসাম্য রক্ষা করাই ঢাকার বড় চ্যালেঞ্জ।
সার্জিও গোর আগামী ৩০ জুলাই ঢাকায় আসবেন। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, এই সফর বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের অগ্রাধিকার তুলে ধরার একটি সুযোগ। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা বুঝতে আগ্রহী হবে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুও সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।