


দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) চেয়ারম্যান শওকত আলীর বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধানে নতুন গতি এনেছে। যুক্তরাজ্যে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ শনাক্ত হওয়ার পর ব্যাংক হিসাব, জাহাজ আমদানির নামে খোলা ঋণপত্র (এলসি), বিদেশি কোম্পানি এবং বিদেশে সম্পদ অর্জনের তথ্য একসঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুদক সূত্র জানায়, শওকত আলী, তাঁর স্ত্রী তাসমিয়া আম্বেরিন, ছেলে জারান আলী চৌধুরী, মেয়ে জারা নামরীন এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ২৮টি ব্যাংকে মোট ১৮৭টি হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিবারের সদস্যদের নামে ৪১টি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ১৪৬টি হিসাব রয়েছে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত এসব হিসাবে মোট জমা হয়েছে ৮ হাজার ৪০৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং উত্তোলন হয়েছে ৮ হাজার ২৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ওই সময় হিসাবগুলোতে স্থিতি ছিল ১৭৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। বর্তমানে এসব হিসাবের কেওয়াইসি, লেনদেনের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
এলসির আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগ
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত ১ জুলাই দুদকের উপপরিচালক মো. মুস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের দল চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কাছে শওকত আলীর মালিকানাধীন এসএন করপোরেশনের জাহাজ আমদানি ও সংশ্লিষ্ট এলসির নথি চেয়েছে। ১০ জুলাইয়ের মধ্যে তথ্য দিতে বলা হলেও সময়মতো তা পাওয়া যায়নি। প্রয়োজন হলে নতুন করে তাগিদপত্র পাঠানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চট্টগ্রাম শাখার মাধ্যমে এসএন করপোরেশনের নামে তিনটি এলসি খোলা হয়। এসব এলসির সুবিধাভোগী ছিল ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে একই ঠিকানায় নিবন্ধিত রেড রুবি গ্রুপ লিমিটেড, ট্যালেন্ট মাইল লিমিটেড এবং কলাম্বিয়া সিস লিমিটেড।
অনুসন্ধানকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ব্যবসায়িক অস্তিত্বের প্রমাণ পাননি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তিনটি এলসির মোট মূল্য প্রায় ১ কোটি ১ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২০১৫ সালের এলসির মূল্য ছিল ৭৪ লাখ ৯৬ হাজার ডলার, ২০২০ সালেরটি ৪ লাখ ৬৪ হাজার ডলার এবং ২০২৩ সালেরটি ২১ লাখ ৪১ হাজার ডলার।
দুদক এখন এসব এলসির বিপরীতে আমদানি হওয়া জাহাজের প্রকৃত মূল্য, বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, অর্থের গন্তব্য এবং আমদানি নথির সত্যতা যাচাই করছে। পাশাপাশি ২০১২ সাল থেকে এসএন করপোরেশনের নামে খোলা ১৪১টি এলসির লেনদেনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব ব্যবসায়িক লেনদেনে ব্যবহারের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
বিদেশি সম্পদের তথ্য চাওয়া হবে
দুদক সূত্র জানিয়েছে, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং যুক্তরাজ্যে শওকত আলী ও তাঁর পরিবারের নামে থাকা সম্পদ, কোম্পানি ও বিনিয়োগের তথ্য সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ শেষ হলে শওকত আলী, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
যুক্তরাজ্যে শনাক্ত ২৫ মিলিয়ন ডলার
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) শওকত আলীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩০৫ কোটি টাকা) শনাক্ত করে। অর্থের উৎস নিয়ে সন্তুষ্ট না হওয়ায় সংস্থাটি চার সপ্তাহের জন্য অর্থটি আটকে রেখে বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেয়।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারায় অর্থ আটকে রাখার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে অর্থটি যুক্তরাজ্য থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্থানান্তর করা হয়, ফলে অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়ে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ইউএই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা এখনো পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কর রিটার্নে সম্পদ ঘোষণা
গত ৮ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান বিদেশে ২৫ মিলিয়ন ডলারের একটি সম্পদ শনাক্ত হওয়ার কথা জানালেও মালিকের নাম প্রকাশ করেননি। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্পদটি শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
জানা গেছে, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিদেশি সম্পদের অনুসন্ধান চলাকালে এই অর্থের তথ্য সামনে আসে। একই সময়ে শওকত আলী তাঁর কর রিটার্নে ওই সম্পদ ঘোষণা করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব জানিয়েছেন, ২০২৫-২৬ করবর্ষে ওই ২৫ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ১৩৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করা হয়েছে।
আইনি নোটিশ
গত ১১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ, এনবিআর, দুদক ও সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আইনি নোটিশ পাঠিয়ে যুক্তরাজ্যের দেওয়া চার সপ্তাহের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণ অনুসন্ধান এবং দায় নির্ধারণের দাবি জানান।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে বিভিন্ন দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অনুসন্ধান শেষ হলে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
এদিকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এনপিবিকে জানিয়েছেন, 'অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার বিষয়ে জানি না। আমাদের সাথে ইউকে থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না আমি জানি না। কারণ তখন আমি চেয়ারম্যান ছিলাম না। শুধু জানি, ১৩৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করেছেন শওকত আলী।'