

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিপুল পণ্য রপ্তানি করা চীন কেন বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানিতে আগ্রহী, তা নিয়ে বর্তমানে নানামুখী আলোচনা চলছে।
তবে চীনের এই আগ্রহ হুট করে নয়, বরং গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে কাঁচা আম আমদানি শুরুর সময়ই তারা কাঁঠাল ও পেয়ারা নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। সফরে অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল ইকোনমিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, যার অন্যতম একটি হলো কাঁঠাল রপ্তানি।
এই সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিক রূপ পেল।
বিশ্বব্যাপী কাঁঠালের বাজার দ্রুত বাড়ছে। ২০১২ সালে কাঁঠাল রপ্তানির বাজার যেখানে ছিল ২০০ কোটি মার্কিন ডলার, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩৭০ কোটি ডলারে।
বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানির ৬০% নিয়ন্ত্রণ করে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর। এর মধ্যে এককভাবে ভিয়েতনামের দখলে রয়েছে ২৫% বাজার।
চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম কাঁঠাল আমদানিকারক ও ভোক্তা দেশ। তারা মূলত ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশ বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারে এর অংশ মাত্র ০.৩%।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট কাঁঠাল রপ্তানির ৭৬% যায় যুক্তরাজ্যে, ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্সসহ এই চার দেশেই রপ্তানি হয় মোট কাঁঠালের ৮৫%। এগুলো মূলত প্রবাসীদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নির্দিষ্ট গণ্ডির বাজার বা ‘এথনিক মার্কেট’।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী:
দেশে প্রতি বছর ৮ থেকে ১০ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। উৎপাদনের দিক থেকে ফলের মধ্যে আম ও কলার পরেই কাঁঠালের অবস্থান তৃতীয়।
অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম থাকা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবের কারণে উৎপাদিত কাঁঠালের ৪৫% এরও বেশি নষ্ট হয়ে যায়।
এ পর্যন্ত দেশে কাঁঠালের ৬টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
তাই চীনে কাঁঠাল বা কাঁঠালজাত পণ্য রপ্তানির এই সুযোগ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকদের মতে, সম্ভাবনা প্রচুর থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সফল হতে হলে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। যেমন-
১. মান নিয়ন্ত্রণ ও সার্টিফিকেশন: বাংলাদেশের কৃষি খাতের একটি বড় অংশ এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে না পারায় ইউরোপের মূল বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না।
২. প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং: কাঁঠাল দ্রুত পচনশীল ফল হওয়ায় এর সংরক্ষণ, প্যাকেজিং এবং পরিবহন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। রপ্তানি উপযোগী কোল্ড চেইন ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির অভাব রয়েছে।
৩. নীতিগত ও আইনি জটিলতা: তৈরি পোশাক খাতের তুলনায় কৃষি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এখনো প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আইনি সহায়তার ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম এবং ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলামের মতে-
চীনের সাথে এই চুক্তিটি দেশের জন্য প্রযুক্তি ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি শেখার বড় সুযোগ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজার ধরার আগে উৎপাদন থেকে প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
রপ্তানির পাশাপাশি দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা ও অভ্যন্তরীণ বাজারের ভারসাম্য বজায় রাখার দিকেও নজর দিতে হবে।
