


জুলাই আন্দোলনে ছাত্রহত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলার আসামির মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে হত্যা মামলার ফেরারি আসামি হিসেবে এজাহারভুক্ত আসামির মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করায় হতবাক হয়েছেন এই আসনের অন্য প্রার্থীরা।
জানা গেছে জুলাই আন্দোলনে হত্যা মামলার ফেরারি আসামি হওয়া সত্ত্বেও মুন্সীগঞ্জ-১ (সিরাজদিখান-শ্রীনগর) সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা সৈয়দা নূরমহল আশরাফি।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) দুপুরে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা এ সিদ্ধান্ত দিলে স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ তার হলফনামায় একাধিক ফৌজদারি মামলার তথ্য গোপন করলেও মনোনয়ন বৈধতা পেয়েছেন। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী এলাকা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ মিরপুর মডেল থানার জিআর ২৫৬/২৫ নম্বর মামলার ৬৯ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি। ওই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ১০৮ জনকে নামীয় আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি দায়ের করা হয় ২০২৫ সালের ১২ মে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই দুপুরে রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণ, মারধর ও হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এতে একাধিক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। আহত এক শিক্ষার্থীকে ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং তার শরীরে এখনও গুলির অস্তিত্ব রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া রামপুরা থানায় দায়ের করা আরেকটি মামলায়ও শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এজাহারনামীয় আসামি বলে জানা গেছে। মামলাটি দায়ের করা হয় ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর। মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা র্যাব-৩, টিকাটুলির এসআই মোস্তাফিজুর রহমান। এ মামলায় তিনি ১২ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি।
মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী অভিযোগ করেন, গুরুতর ফৌজদারি মামলার এজাহারনামীয় ও ফেরারি আসামির মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা নির্বাচনী আইন ও নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন। এতে আসন্ন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে জানতে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘আমার কাছে নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া নির্দেশিকা রয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছি।’
জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি মামলা গোপণ করেছে এ তথ্য তাদের জানা আছে কি না জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা নিয়ম-কানুন মেনেই বৈধ ঘোষণা করেছি।’
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেখ মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহর সঙ্গে। তার মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। মেসেজের কোনো রিপ্লাই দেননি।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘জুলাই গণহত্যার আসামির মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা চরম অনিয়ম। জেলা প্রশাসন কোনোভাবেই এমন একজন আসামির মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করতে পারে না। যদি এমন হয়েই থাকে তবে অবশ্যই জেলা প্রশাসককে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।’
নির্বাচন কমিশনের সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন এই সরকারের বৈধতা দিয়েছে। আমাদের জন্য রেড লাইন হলো জুলাই এর গণঅভ্যূত্থান। জুলাই হত্যা মামলার আসামিদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা নিঃসন্দেহে একটি হঠকারিতা। এমন কোনো নির্দেশনা কমিশনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি জেলা প্রশাসন কিংবা রিটার্নিং অফিসারদের। এরপরও যদি এমন কেউ করে থাকে তার ব্যাপারে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবো।’
এদিকে একই দিনে অনুষ্ঠিত যাচাই-বাছাইয়ে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গরমিল পাওয়ায় বিএনপির দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হওয়া প্রার্থীরা হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু এবং জেলা কমিটির সদস্য ও শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোমিন আলী। প্রশাসন সূত্র জানায়, তাদের দাখিল করা মনোনয়নপত্রে সমর্থনকারী ভোটারদের স্বাক্ষরের সঙ্গে তালিকাভুক্ত তথ্যের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে।
যাচাই-বাছাই শেষে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বৈধ প্রার্থীরা হলেন বিএনপির শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আতিকুর রহমান, জামায়াতে ইসলামীর এ কে এম ফখরুদ্দিন রাজী, কমিউনিস্ট পার্টির আব্দুর রহমান এবং বিপ্লব ইনসানিয়াত বাংলাদেশের প্রার্থী রোকেয়া আক্তার।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে রিট অথবা নির্বাচন কমিশনে আপিল করা হবে।
মন্তব্য করুন