

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


গর্ভকালীন সময়টি প্রতিটি নারীর জীবনে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এ সময় হবু মা এবং গর্ভস্থ শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সঠিক পুষ্টি ও সঠিক যত্ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
তবে অজ্ঞতা, ভুল ধারণা এবং প্রচলিত কিছু সামাজিক কুসংস্কারের কারণে অনেক সময় গর্ভবতী মায়েরা এমন কিছু ভুল করে বসেন, যা মা ও শিশু দুজনের জন্যই মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গর্ভকালীন পুষ্টি ও যত্নের ক্ষেত্রে সচরাচর যেসব ভুল এড়ানো উচিত, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বা "দুই জনের খাবার" খাওয়া
গর্ভধারণের পর অনেকেই মনে করেন মাকে এখন থেকে দুজন মানুষের খাবার একসাথে খেতে হবে। এটি অত্যন্ত প্রচলিত একটি ভুল ধারণা। গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে অতিরিক্ত ক্যালরির প্রায় কোনো প্রয়োজনই হয় না এবং পরবর্তী মাসগুলোতেও মাত্র ৩০০ থেকে ৪৫০ অতিরিক্ত ক্যালরিই যথেষ্ট।
অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যায়, যা পরবর্তীতে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রসবকালীন নানা জটিলতার সৃষ্টি করে। তাই পরিমাণের চেয়ে খাবারের পুষ্টিগুণের দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি।
২. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া বা বন্ধ করা
গর্ভকালীন সময়ে ফলিক অ্যাসিড, আয়রন ও ক্যালসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা অনুপুষ্টির চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। সাধারণ খাবার থেকে প্রায়ই এই চাহিদা পুরোপুরি পূরণ হয় না। চিকিৎসকের দেওয়া এসব সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত না খাওয়া বা নিজ থেকে বন্ধ করে দেওয়া বড় ধরনের ভুল।
একইভাবে, সামান্য গ্যাস্ট্রিক, মাথাব্যথা বা ঠান্ডার সমস্যায় ড ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া শিশুটির শারীরিক গঠনে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
৩. পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে কুসংস্কারে কান দেওয়া
আমাদের সমাজে গর্ভবতী মহিলাদের খাবার নিয়ে নানা রকম কুসংস্কার প্রচলিত আছে। যেমন— হাঁসের ডিম খেলে বাচ্চার হাঁপানি হবে, আনারস বা পেঁপে খেলে গর্ভপাত হবে, কিংবা নির্দিষ্ট কিছু মাছ খাওয়া যাবে না।
কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়া এসব পুষ্টিকর খাবার তালিকা থেকে বাদ দিলে মা ও শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। সুষম ও নিরাপদ সব ধরনের খাবার পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করাই মূল কথা।
৪. খাদ্যাভ্যাস ও পানি পানের অবহেলা
গর্ভাবস্থায় প্রোটিন, শাকসবজি ও ফলমূলের ঘাটতি এবং প্রক্রিয়াজাত বা অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস হবু মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া পর্যাপ্ত পানি না পান করার ভুলটি অনেকেই করেন।
গর্ভাবস্থায় শরীরে জলের চাহিদা বাড়ে; পর্যাপ্ত পানি না খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য, প্রস্রাবে সংক্রমণ (UTI) এবং পানিশূন্যতার সৃষ্টি হতে পারে, যা সময়ের আগেই প্রসববেদনা ওঠার মতো ঝুঁকি বাড়ায়।
৫. বিশ্রামের অভাব ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ
কেবল খাবার ভালো খেলেই চলে না, পর্যাপ্ত বিশ্রামও গর্ভকালীন যত্নের প্রধান শর্ত। দিনে অন্তত ১–২ ঘণ্টা দুপুরের বিশ্রাম এবং রাতে ৭–৮ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম গর্ভস্থ শিশুর সঠিক বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
অনেকে এই সময় গৃহস্থালি বা পেশাগত কাজে অতিরিক্ত চাপ নেন কিংবা মানসিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন। মায়ের মানসিক চাপ শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করতে পারে।
৬. সম্পূর্ণ শারীরিক শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বা অতিরিক্ত বিশ্রাম
বিশ্রামের প্রয়োজন হলেও সারাদিন শুয়ে-বসে থাকা বা কোনো রকম শারীরিক কার্যকলাপ না করাও একটি ভুল পদক্ষেপ। চিকিৎসক কোনো বিশেষ কারণে 'বেড রেস্ট' না দিলে, হালকা হাঁটাচলা ও নিরাপদ ব্যায়াম করা উচিত।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, পায়ে রক্ত জমাট বাঁধা এবং প্রসবকালীন জটিলতা বাড়ায়।
৭. নিয়মিত ডাক্তারি পরীক্ষা (ANC) অবহেলা করা
অনেক সময় প্রসূতি মা শারীরিক কোনো বড় সমস্যা অনুভব না করলে নিয়মিত অ্যান্টিনেটাল চেকআপ বা চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বন্ধ করে দেন। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ভুল। নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা এবং শিশুর হৃদস্পন্দন মাপার মাধ্যমে গর্ভস্থ কোনো জটিলতা শুরুর আগেই শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
গর্ভকালীন সময়টিকে ঝুঁকিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সঠিক সময়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ইতিবাচক মানসিক অবস্থা এবং চিকিৎসকের সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা মেনে চললেই যেকোনো অপ্রীতিকর ভুল এড়িয়ে একটি সুস্থ সুন্দর শিশুর জন্ম দেওয়া সম্ভব।


