শনিবার
১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্যায় সাপের উপদ্রব রোধে করণীয় ও প্রয়োজনীয় সাবধানতা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম
এনপিবি কোলাজ
expand
এনপিবি কোলাজ

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বন্যার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম ও এর নদী তীরবর্তী অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলা সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছে।

বন্যার এই করাল গ্রাসের সাথে যোগ হয়েছে আরেকটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত মারাত্মক আতঙ্ক- সাপের প্রকোপ। বন্যার পানিতে সাপের প্রাকৃতিক বাসস্থান বা গর্ত তলিয়ে যাওয়ায় এগুলো বাঁচার তাগিদে শুকনো জায়গা তথা মানুষের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র এবং গবাদি পশুর খোঁয়াড়ে আশ্রয় নিচ্ছে।

তাই এই দুর্যোগকালীন সময়ে সাপের হাত থেকে বাঁচতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।

বর্ষা ও বন্যায় সাপের উপদ্রব বাড়ার কারণ

বাসস্থান ধ্বংস: ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাপের চারণভূমি ও গর্ত পানিতে ডুবে যায়। ফলে তারা নিরুপায় হয়ে উঁচু এবং শুকনো জায়গার খোঁজে লোকালয়ে চলে আসে।

খাদ্যের সন্ধান: বন্যার পানিতে ইঁদুর, ব্যাঙ ও অন্যান্য ছোট প্রাণীও বাঁচার জন্য মানুষের ঘরে আশ্রয় নেয়। এই শিকারগুলোর পিছু পিছু সাপও সহজে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে।

জলাবদ্ধতা ও ভাসমান কচুরিপানা: বন্যার পানিতে ভেসে আসা কচুরিপানা বা জঞ্জাল সাপের চমৎকার অস্থায়ী আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে, যা অনেক সময় মানুষের সংস্পর্শে চলে আসে।

সাপের প্রকোপ থেকে বাঁচতে প্রয়োজনীয় সাবধানতা

বন্যায় জীবন ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে নিম্নলিখিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো দ্রুত গ্রহণ করা উচিত:

১. ঘরবাড়ি ও চারপাশ পরিষ্কার রাখা

ঘরের চারপাশ, বিশেষ করে আঙিনা, ঝোপঝাড় এবং লাকড়ির স্তূপ নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। ঘরের মেঝেতে বা খাটের নিচে কোনো অন্ধকার বা জঞ্জালযুক্ত স্থান রাখা যাবে না।

কার্বলিক অ্যাসিডের বোতল ঘরের কোণে বা প্রবেশদ্বারে মুখ খুলে রাখা যেতে পারে (যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে দ্বিমত আছে, তবে তীব্র গন্ধ সাপকে দূরে রাখতে সাহায্য করে)। ব্লিচিং পাউডার বা লাইসল দিয়েও ঘর পরিষ্কার করা যায়।

২. রাতে চলাচলে সতর্কতা

রাতে ঘরের বাইরে বের হলে অবশ্যই শক্তিশালী টর্চলাইট বা হারিকেন ব্যবহার করতে হবে। অন্ধকারে চলাচলের সময় হাতে একটি লাঠি রাখা এবং সেটি দিয়ে মাটিতে শব্দ বা আঘাত করা উচিত, যাতে সাপ থাকলে তা আগেই সরে যায়।

ঘুমানোর সময় মেঝে পরিহার করে উঁচু খাটে ঘুমানো এবং অবশ্যই চারদিক ভালো করে গুঁজে মশারি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।

৩. দৈনন্দিন কাজ ও রান্নাঘরে সতর্কতা

রান্নার জন্য স্তূপ করে রাখা লাকড়ি বা খড়খড়িতে হাত দেওয়ার আগে লাঠি দিয়ে ভালো করে নাড়িয়ে নিতে হবে। বন্যা বা বৃষ্টির পানি জমে থাকা স্থানে খালি পায়ে বা হাত দিয়ে কাজ করা যাবে না, সম্ভব হলে গামবুট ও মোটা গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে।

সাপে কাটলে করণীয় এবং বর্জনীয় (ফার্স্ট এইড)

যদি কেউ সাপের দংশনের শিকার হন, তবে আতঙ্কিত না হয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে হবে:

আক্রান্ত অংশ স্থির রাখা: রোগীকে শান্ত রাখতে হবে এবং দংশিত স্থানটি যতটা সম্ভব কম নড়াচড়া করতে হবে।

হাত বা পায়ে কামড়ালে সেটি কাঠ বা বাঁশের চটা দিয়ে বেঁধে স্থির (Immobilize) করে ফেলা উচিত।

অনতিবিলম্বে হাসপাতালে নেওয়া: ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের পেছনে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে রোগীকে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে হবে।

অ্যান্টিভেনম নিশ্চিত করা: বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই এখন বিনামূল্যে সাপের বিষের প্রতিষেধক বা 'অ্যান্টিভেনম' সরবরাহ করা হয়।

যা কখনোই করবেন না:

ক্ষতস্থানে ব্লেড বা ছুরি দিয়ে কাটা, মুখ দিয়ে বিষ চোষা, শক্ত করে একাধিক গিঁট দেওয়া, কিংবা কোনো ধরনের ভেষজ ওষুধ বা চুন-মরিচ লাগানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এগুলো রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো কঠিন সময়ে সাপের উপদ্রব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি পরিবেশগত বিপর্যয়ের একটি সরাসরি ফলাফল। তবে সঠিক সচেতনতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সাপে কাটার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু প্রায় শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন করে গ্রামীণ ও উপদ্রুত অঞ্চলের মানুষকে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল হতে হবে।

একই সাথে, বন্যাকবলিত এলাকার স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের মজুদ নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসকদের ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত রাখা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

দুর্যোগের এই সময়ে পারস্পরিক সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তাই পারে আমাদের গ্রামীণ জনপদকে সাপের এই মরণথাবা থেকে রক্ষা করতে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Norway VS England
Scheduled
12 Jul, 03:00 AM
VS
World Cup