

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আটলান্টিক মহাসাগরের রহস্যময় অঞ্চল বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে মানুষের আগ্রহ বহু পুরোনো। বছরের পর বছর ধরে জাহাজ ও বিমান নিখোঁজ হওয়ার নানা ঘটনা ঘিরে অসংখ্য গল্প, কল্পনা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব মানুষের মাঝে কৌতুহল সৃষ্টি করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চল নতুন করে আলোচনায় এসেছে এক ভিন্ন কারণে। এবার রহস্যের কেন্দ্রে অতিপ্রাকৃত কোনো ব্যাখ্যা নয়, বরং পৃথিবীর গভীরে থাকা অস্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক গঠন।
যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক সম্প্রতি জানিয়েছেন, বারমুডা দ্বীপপুঞ্জের নিচে এমন একটি ভূগর্ভস্থ স্তর রয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও এখনো শনাক্ত হয়নি।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন কার্নেগি সায়েন্সের ভূকম্পবিদ উইলিয়াম ফ্রেজার ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেফ্রি পার্ক। তাদের মতে, এই বিশেষ গঠনই ব্যাখ্যা করতে পারে কেন বহু আগে আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম থেমে গেলেও বারমুডা এখনও আশপাশের সমুদ্রতলের তুলনায় অনেক উঁচু অবস্থানে রয়েছে।
সাধারণভাবে হাওয়াইয়ের মতো আগ্নেয় দ্বীপ তৈরি হয় পৃথিবীর গভীর থেকে উঠে আসা উত্তপ্ত শিলাস্তম্ভ বা ‘ম্যান্টল প্লুম’-এর প্রভাবে। এসব উত্তপ্ত পদার্থ উপরের দিকে চাপ সৃষ্টি করে সমুদ্রতলকে উঁচু করে তোলে এবং আগ্নেয়গিরির জন্ম দেয়। পরে টেকটোনিক প্লেট সরে গেলে ও আগ্নেয় কার্যকলাপ কমে এলে সেই অংশ ধীরে ধীরে নিচে নেমে যায়। কিন্তু বারমুডার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা ভিন্ন ধরনের চিত্র দেখতে পেয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, বারমুডা এখনো সমুদ্রতলের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ ফুট উঁচু একটি বিস্তৃত স্ফীত অঞ্চলের ওপর অবস্থান করছে। এই অস্বাভাবিক অবস্থার কারণ খুঁজতে গবেষকেরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে হওয়া বড় ভূমিকম্প থেকে উৎপন্ন ভূকম্পীয় তরঙ্গ বিশ্লেষণ করেন। এসব তরঙ্গ পৃথিবীর ভেতর দিয়ে চলার সময় বিভিন্ন স্তরের ঘনত্ব ও গঠনের ওপর ভিত্তি করে গতি পরিবর্তন করে। সেই তথ্য ব্যবহার করে বারমুডার নিচের প্রায় ২০ মাইল গভীর পর্যন্ত ভূঅভ্যন্তরের একটি ধারণাচিত্র তৈরি করা সম্ভব হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমুদ্রীয় ভূত্বকের নিচে প্রায় ১২ মাইলের বেশি পুরু একটি হালকা শিলাস্তর রয়েছে। এর ঘনত্ব আশপাশের ম্যান্টলের তুলনায় কম হওয়ায় এটি ভাসমান বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে। গবেষকদের মতে, এই স্তরটি অনেকটা ভেলার মতো কাজ করছে এবং বারমুডাকে উঁচু অবস্থানে ধরে রাখতে সাহায্য করছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, ‘আন্ডারপ্লেটিং’ নামে পরিচিত এই গঠন বহু কোটি বছর আগে আগ্নেয় কার্যক্রমের সময় তৈরি হয়েছিল। তখন কার্বনসমৃদ্ধ গলিত ম্যান্টল শিলা ভূত্বকের নিচে প্রবেশ করে ঠান্ডা হয়ে শক্ত স্তরে পরিণত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এর উৎস পৃথিবীর গভীরের এমন এক সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, যখন সুপারমহাদেশ প্যাঞ্জিয়া গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল।
গবেষক উইলিয়াম ফ্রেজারের ভাষ্য অনুযায়ী, বারমুডা ভূতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, কারণ এখানকার বৈশিষ্ট্য প্রচলিত ম্যান্টল প্লুম তত্ত্বের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি জানান, এখানে যে ধরনের ঘন আন্ডারপ্লেটিং দেখা গেছে, তা সাধারণত অন্য প্লুম অঞ্চলে পাওয়া যায় না। সাম্প্রতিক ভূ-রাসায়নিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে এটি ইঙ্গিত করে যে পৃথিবীর ম্যান্টলের ভেতরে আরও জটিল কিছু প্রক্রিয়া সক্রিয় রয়েছে, যেগুলো এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি।
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু বারমুডা অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক রহস্য বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, বরং পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরের গঠন ও গতিশীলতা সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই গবেষণার সঙ্গে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে প্রচলিত অলৌকিক গল্পের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। ফ্লোরিডা, বারমুডা ও পুয়ের্তো রিকোর মধ্যবর্তী এলাকায় অতীতে ঘটে যাওয়া জাহাজ ও বিমান দুর্ঘটনার পেছনে প্রতিকূল আবহাওয়া, শক্তিশালী সমুদ্রস্রোত, ঘন নৌ ও বিমান চলাচল এবং মানবিক ভুলকেই মূল কারণ হিসেবে দেখা হয়।
তারপরও বারমুডার রহস্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং পৃথিবীর গভীরে লুকিয়ে থাকা এই অস্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক গঠন আবারও মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির ভেতরে এখনো বহু অজানা তথ্য ও বিস্ময় রয়ে গেছে।
সূত্র: এনডিটিভি
