শনিবার
২১ মার্চ ২০২৬, ৭ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
২১ মার্চ ২০২৬, ৭ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঈদি, সালামি, ঈদিয়া: ফাতেমীয় আমল থেকে কীভাবে যুগে যুগে নাম বদলেছে?

বিবিসি বাংলা
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২৬, ০৩:২১ পিএম আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৬, ০৩:২২ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

ঈদের দিনে শুরুতেই শিশু ও তরুণরা যে জিনিসটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, তা হলো সালামি, যেটা আরবিতে ঈদিয়া বা ঈদি হিসেবে পরিচিত।

সাধারণত বাবা-মা ও বয়সে বড় আত্মীয়রা ছোটদের মধ্যে এটি বিতরণ করেন। ঈদে মুসলমানদের ধর্মীয় রীতির অংশ হিসেবে অনেকেই ঈদি বা ঈদিয়ার অপেক্ষা করে।

কিন্তু এর ঐতিহাসিক উৎস কী? এটি কীভাবে শুরু হলো? আর কবে থেকে এর প্রচলন?

কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায়, 'ঈদিয়া' শব্দটি 'ঈদ' থেকে এসেছে, যার অর্থ দান বা উপহার। সেসব বিবরণ অনুযায়ী, ঈদের দিনে উপহারের আবির্ভাব হয়েছিল মিসরের ফাতেমীয় যুগে। অর্থাৎ হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে, যেটা ছিল খ্রিষ্টীয় দশম শতক। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে টাকা ও কাপড় বিতরণ করা হতো।

ঈদের উপহারের তখন বিভিন্ন নাম ছিল, যেমন 'রুসুম' ও 'তাওসিয়া'। রাজপুত্রদের দেওয়া হতো সোনার দিনার, আর শিশুদের দেওয়া হতো উপহার এবং অর্থ।

ফাতেমীয় আমল: 'ঈদের উপহারের জন্ম'

ফাতেমীয় যুগের ইতিহাসবিদদের লেখায় খলিফাদের ঈদ উদযাপনের সাথে সম্পর্কিত আচার-অনুষ্ঠান এবং রীতিনীতির বিবরণ পাওয়া যায়। এই আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল 'ঈদিয়া', যা প্রথমবারের মতো অন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে আলাদা উপহার হিসেবে চালু হয়।

এটি শুরু হয় খলিফা আল-মু'ইয লি-দীনিল্লাহ আল-ফাতেমীর সময়। তিনি মিশরে তার শাসনামলের শুরুতে মানুষের মন জয় করতে চেয়েছিলেন।

তাই তিনি মিষ্টি বিতরণ, ভোজের আয়োজন, অর্থ ও উপহার বিতরণ এবং ঈদের নতুন পোশাক দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই পোশাক বা কসওয়া ঈদের প্রায় দেড় মাস আগে থেকেই প্রস্তুত করা হতো, যাতে ঈদে আগের রাতে বিতরণ করা যায়।

হিজরি ষষ্ঠ শতকে শুধু পোশাক তৈরির জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ হাজার স্বর্ণ দিনার। এগুলো রাষ্ট্রের কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হতো।

ইসলামিক ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ ড. আইমান ফুয়াদ বলেন, ‘মিশরে অধিকাংশ ধর্মীয় উৎসবের প্রচলন ফাতেমীয় যুগ থেকেই। তখনও মুসলিম বিশ্বে দুটি বড় উৎসব ছিল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ফাতেমীয়রা মিশরে এসে নানাভাবে উদযাপন ও রীতিনীতি যোগ করেন।’

‘বর্তমানের ঈদ উপহারের ধারণাটি তখন ছিল না। তবে ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, রমজান শুরু হলে খলিফার দরবারের পদাধিকারী, দাস, খলিফার আশেপাশের ব্যক্তিবর্গ, এমনকি খলিফার স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য মিষ্টিভরা থালা দেওয়া হতো, যার মাঝখানে স্বর্ণমুদ্রা থাকত। রাষ্ট্রের লোকেরাও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে উপহার পেতেন। এটিকে তখন বলা হতো 'তাওসিয়া', যা ফাতেমীয় যুগে চালু ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফাতেমীয়রাই ঈদ উপলক্ষে 'দার আল-ফিতরা' চালু করেন। সেখানে ফিতরাহ হিসেবে মিষ্টান্ন, অন্যান্য খাবার ও পোশাক বিতরণ করা হতো এবং প্রাসাদের সোনালী কক্ষে বড় ভোজের আয়োজন করা হতো। এই ভোজ ফাতেমীয় প্রাসাদের 'গোল্ডেন হল'-এ আয়োজন করা হতো এবং ঈদের প্রথম দিনে সবার জন্য খাবার উন্মুক্ত থাকত।’

ফাতেমীয়রা এই ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত ছিল যা 'ইদিয়া' নামে উল্লেখ করা হতো। তখন ঈদের আগে কোরআন খতমের পর খলিফা নিজ হাতে আলেম, কুরআন তিলাওয়াতকারী ও মুয়াজ্জিনদের রূপার মুদ্রা উপহার দিতেন। এমনকি রাজা-বাদশাহরাও ঈদের সময় উপহার পেতেন।

ইবন দিহইয়া (মৃত্যু ৬৩৩ হিজরি/১২৩৫ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর 'আল-মুতরিব' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ঈদের দিনে লোকেরা সুলতান আল-মুতামিদ ইবন আব্বাদকে (মৃত্যু ৪৮৮ হিজরি/১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) রাজাদের উপযোগী উপহার পেশ করেছিল।’

প্রথম দিকে 'আল-তাওসিআহ' নামে পরিচিত ছিল ঈদিয়া, অর্থাৎ ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত অর্থ বিতরণ। ঈদের দিন সকালবেলা প্রাসাদ থেকে খলিফার তত্ত্বাবধানে জনগণের কাছ থেকে শুভেচ্ছা জানাতে আসা ব্যক্তিদের রুপার দিরহাম ও স্বর্ণের দিনার বিতরণ করা হতো।

মামলুক যুগে 'তাওসিআ' থেকে 'জামকিয়া'

মামলুক যুগে ঈদের উপহার আনুষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে এবং তখন একে বলা হতো 'আল-জামকিয়া'। এটি শুধু শিশুদের জন্য না, ছোট-বড় সবার জন্যই ছিল।

'জামকিয়া' ছিল সুলতানের আদেশে দেওয়া বিশেষ ভাতা, যা ঈদ উপলক্ষে সৈন্য থেকে শুরু করে রাজপুত্র ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দেওয়া হতো।

'জামকিয়া' শব্দটি তুর্কি 'জামা' শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ কাপড় বা পোশাক। অর্থাৎ এটি ছিল ঈদের নতুন পোশাক কেনার জন্য বরাদ্দ অর্থ। এর উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে সহায়তা করা এবং ঈদের জন্য বিশেষভাবে নতুন পোশাক কিনতে সক্ষম করা।

ওসমানীয় বা অটোমান যুগে পরিবর্তন

ওসমানীয় বা অটোমান যুগে ঈদিয়া একটি ভিন্ন রূপ ধারণ করে, কারণ এটি জনগণের মধ্যে একটি জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং রীতিতে পরিণত হয়। এটি আর রাষ্ট্রীয়ভাবে বিতরণ করা উপহার ছিল না, বরং মানুষ নিজেদের মধ্যেই এটি পালন করা শুরু করে।

তখন ঈদের সময় উপহার দেয়া আনন্দের প্রকাশ ও পারস্পরিক সহমর্মিতার সামাজিক রূপ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু অর্থ নয়, খাবার, পোশাকসহ নানা উপহারও এর অংশ হয়।

সময়ের সাথে সাথে 'ঈদিয়া'র ধরন পরিবর্তন হতে থাকে এবং পরিবারভিত্তিক নগদ অর্থে সীমিত হয়ে যায়, যা বয়স অনুযায়ী ভিন্ন পরিমাণে হয়।

আধুনিক যুগে ঈদিয়ার বিকাশ

ওসমানীয় যুগের অবসান থেকে আধুনিক যূগের সূচনার সাথে 'ঈদিয়া' এখনকার সময়ের মতোই পরিচিত হয়ে ওঠে। পরিবারের প্রধান ব্যক্তি ও বড়রা শিশুদের মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণ করেন। শিশুদের কাছে 'ঈদিয়া' বিশেষ আনন্দ এবং কে কত টাকা পেল তা নিয়ে গর্ব করার বিষয়।

যদিও 'ঈদিয়া'র মধ্যে খেলনা, মিষ্টি ও পোশাকের মতো বিভিন্ন উপহার থাকতে পারে। তবে বর্তমানে এটি মূলত সেই নগদ অর্থকেই বোঝায় যার জন্য অনেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।

আমরা বাংলাদেশে যেটি সালামি নামে চিনি, বর্তমানে আরব দেশগুলোতে সেটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। সৌদি আরবসহ, জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত ও মিশরে এটি 'ঈদিয়া' হিসেবেই পরিচিত। সৌদি আরবের কিছু অঞ্চলভেদে "হাওয়ামা", "খাব্বাজা", "হাক্কাকা" বা "ক্কারকিআন" বলা হয়। কিছু দেশ, যেমন ওমানে এটি 'আয়্যুদ' নামে পরিচিত। তিউনিসিয়ার মতো কিছু উত্তর আফ্রিকান দেশে এটি 'মাহবাত আল-ঈদ' এবং মরক্কোয় 'ফলুস আল-ঈদ' নামে পরিচিত।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন