শুক্রবার
৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রযুক্তিগত সমাধানের ঊর্ধ্বে গিয়ে ন্যায়সংগত পানি ব্যবস্থাপনার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৩ পিএম
প্রযুক্তিগত সমাধানের ঊর্ধ্বে গিয়ে ন্যায়সংগত পানি ব্যবস্থাপনার আহ্বান বিশেষজ্ঞরা
expand
প্রযুক্তিগত সমাধানের ঊর্ধ্বে গিয়ে ন্যায়সংগত পানি ব্যবস্থাপনার আহ্বান বিশেষজ্ঞরা

কেবল প্রকৌশল-নির্ভর প্রযুক্তিগত সমাধান বা ‘টেকনো-ফিক্স’ দিয়ে পানির সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়বিচার, জেন্ডার সমতা এবং পরিবেশগত অধিকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি কাঠামো।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) শুরু হওয়া ১১তম আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের প্রথম দিনে বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশের পানি শাসনে এই আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানান।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশের আয়োজনে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে ‘ন্যায়সংগত ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা পুনর্চিন্তা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এই দু’দিনব্যাপী সম্মেলন শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ‘জাতিসংঘ পানি কনভেনশনে’ যোগদানের প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

সকালে বরেণ্য প্রয়াত সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীনের গানের মাধ্যমে সম্মেলনের সূচনা হয়। উদ্বোধনী বক্তব্যে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, “পানি শাসন ব্যবস্থা মূলত ক্ষমতা, টিকে থাকা এবং অসমতার বিষয়। নীতি প্রণয়নের অনেক আগেই পানি মানুষের জীবন নির্ধারণ করে দেয়।” উপকূলীয় অঞ্চলের এক নারীর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “পানি লবণাক্ত হলে ব্যবহার্য পানির জন্য নারীদের অনেক দূর হাঁটতে হয়, বন্যা হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এটাই বাস্তব চিত্র - কে সিদ্ধান্ত নেয়, কে মানিয়ে নেয় এবং কাদেরকে এর চড়া মূল্য দিতে হয়।” জাতিসংঘ কনভেনশনে যোগদানকে মাইলফলক উল্লেখ করলেও তিনি সতর্ক করে বলেন, “আইনি প্রতিশ্রুতিই যথেষ্ট নয়। কনভেনশনে যোগদান মানেই রূপান্তর নয়। শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, কেবল শেষে পরামর্শক হিসেবে রাখলে চলবে না।”

সম্মেলনের প্রথম সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সেন্টার ফর অল্টারনেটিভস-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বিশ্বজুড়ে পানি ব্যবস্থাপনার পাঁচটি ‘ডিস্টোপিয়া’ বা সংকট চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, “পানি কেবল H₂O নয়। আমাদের সংজ্ঞায়িত করা উচিত: পানি (W) = H₂O + P4 (দূষণ, ক্ষমতা, রাজনীতি এবং মুনাফা)।” তিনি নদীকে ‘প্রাণ, আত্মা ও শক্তি’র সমন্বয়ে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখার আহ্বান জানান। তিনি জবাবদিহিতা নিশ্চিতে ‘নদী-হ্রদ প্রধান’ বা রিভার-লেক চিফ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন, যেখানে স্থানীয় কর্মকর্তাদের পরিবেশগত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা হবে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের (এনআরসিসি) প্রতিনিধি সাকিব মাহমুদ দেশের নদ-নদীর করুণ চিত্র তুলে ধরে বলেন, “দেশে ১,৪১৫টি নদী চিহ্নিত হলেও অনেকগুলোই অস্তিত্ব সংকটে। দিনাজপুর ও নওগাঁর মতো শহরাঞ্চলে আমরা ‘ডেড জোন’ বা মৃত এলাকা শনাক্ত করেছি, যেখানে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা জলজ প্রাণীর বাঁচার অনুপযুক্ত।” তিনি ড্রেজিং বা নদী খননে অব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করে বলেন, উত্তোলিত মাটি অনেক সময় পুনরায় নদীতেই ফেলা হয়। এই চক্র বন্ধে জিও-স্পেশাল ট্র্যাকিং এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক নজরদারির ওপর জোর দেন তিনি।

শ্রীলঙ্কার রুহুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. চম্পা এম নাভারত্নে বলেন, “কাঠামোগত অসমতাকে উপেক্ষা করায় কারিগরি সমাধানগুলো প্রায়ই ব্যর্থ হয়। পানি ব্যবস্থাপনায় নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক হতে হবে। পানির অধিকার ও ঋণের সুবিধা না থাকলে প্রযুক্তি সমাধানের বদলে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।”

শহরের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিল্ড বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট ফরহাদ রেজা সতর্ক করে বলেন, পানিকে পণ্য হিসেবে দেখা যাবে না। ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় সরবরাহ-কেন্দ্রিক প্রকৌশল থেকে বেরিয়ে এসে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে।

চীনের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. ইয়াং হুই ‘দিয়ানচি হ্রদ’ পুনরুদ্ধারের উদাহরণ দিয়ে বলেন, “মূল বিষয় হলো মানসিকতার পরিবর্তন। শহর জলাশয়ের পাশে গড়ে ওঠে না, বরং শহর জীবন্ত পানি ব্যবস্থারই একটি অংশ।”

এছাড়া এই দিন প্রথম দিনের অধিবেশনে ‘ওয়াটার মিউজিয়াম’ বা পানি জাদুঘর নিয়ে বিশেষ ভার্চুয়াল প্রদর্শনী হয়। এতে মরক্কোর ‘ওয়েসিস ইকোমিউজিয়াম’ এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ ও এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর’-এর ডিজিটাল প্রদর্শনী হয়। এছাড়া নাট্যদল ‘পালাকার’-এর নির্দেশনায় চাকমা ভাষায় গান, হ্যাপি হোমের কন্যা-শিশুদের নাটক ‘জিওন, দ্য এনচেন্টেড লাইফ রিভার’ পানি ও জীবনের গভীর সম্পর্ক তুলে ধরে।

সম্মেলনের প্রথম দিন শেষে পানি ব্যবস্থাপনায় ভূমি ব্যবহার ও জনসংখ্যা পরিকল্পনার সমন্বয়ে ‘হাইড্রো-সোশ্যাল’ বা পানি-সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। আগামীকাল বুধবার (২২ জানুয়ারি) সম্মেলনের শেষ দিনে ব্লু ইকোনমি ও আন্তঃসীমানা নদী নিয়ে আলোচনা হবে এবং পানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে ‘জবাবদিহিতামূলক পানি শাসন বিষয়ক ঢাকা ঘোষণা’ পেশ করার মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ হবে।

এসময় অনুষ্ঠানে একশনএইড বাংলাদেশ-এর জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ, ড. এমা পরিও; ড. নুয়েন হো কুয়েন; আনিকা এন হক সহ দেশ-বিদেশের শতাধিক নদী বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নীতিনির্ধারক, পানি অধিকার কর্মী এবং জলবায়ু সুরক্ষা কর্মী অংশ নেন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X