

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সকাল থেকে সংগীতশিল্পী ও সংগীত পরিচালক ইমন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে দুপুরের দিকে তাঁর নিকেতনের স্টুডিওতে পৌঁছানো গেল।
কফি হাতে ফিরেই তিনি বললেন, “গানের পাশাপাশি কফিও খারাপ বানাই না।” তারপরই শুরু হলো আড্ডা। নতুন গান তৈরির গল্প বলতে গিয়ে তিনি আমাদের সমতল থেকে পাহাড়ি ঝিরিপথ আর রাঙামাটির অরণ্যে নিয়ে গেলেন।
বাংলাদেশের সমতল, পাহাড় ও সাগরপাড়ের সংস্কৃতিকে একসাথে উপস্থাপন করার স্বপ্ন দেখতেন ইমন। এর আগেও কোক স্টুডিও বাংলায় তিনি ‘কথা কইয়ো না’ গানটির সঙ্গে মৈমনসিংহ গীতিকার অংশ যুক্ত করে প্রশংসিত হয়েছিলেন। এবার তাঁর বড় পরিকল্পনা থেকে জন্ম নিলো “বাজি” গান, যা দিয়ে এক বছরের বিরতির পর কোক স্টুডিও বাংলা ফিরে এলো।
গানটিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বাদ্যযন্ত্র ও লোকসংগীতের সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। ইমনের ভাষায়, “গান আমার কাছে থালার মতো। এর মধ্যে নানা স্বাদ রাখা যায়, কিন্তু সেগুলো আলাদা আলাদাভাবেই উপভোগ করা উচিত। আমি খিচুড়ি বানাতে চাই না।”
শিল্পী খোঁজার অভিজ্ঞতা
এই গান তৈরিতে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১০০ জন শিল্পী। পাহাড় থেকে সমতল—সব জায়গা ঘুরে তাঁদের খুঁজে বের করতে হয়েছে। গানটিতে স্থান পেয়েছে হাশিম মাহমুদের লেখা ‘বাজি’ গান এবং শতবর্ষী ‘ধুয়া’ গান। টাঙ্গাইল থেকে আসা ধুয়া গানের দল, মারমা ভাষায় কণ্ঠ দেওয়া ম্রাকোই চিং মারমা (নানি), বাওমা নৃত্য, মণিপুরি সম্প্রদায়ের উপস্থাপনাসহ নানা রূপ উঠে এসেছে গানে।
ইমন শেয়ার করলেন মজার কিছু গল্পও। যেমন, নানিকে প্রথমে রাজি করাতে সময় লেগেছিল, কারণ ঢাকায় আসার অভিজ্ঞতা ছিল না তাঁর বা তাঁর মেয়ের। আবার ধুয়া গানের দল প্রথমে রাজি হয়নি, কারণ তারা ইটভাটায় কাজ করছিল। অবশেষে ঢাকায় এনে আড্ডা ও খাওয়াদাওয়ার মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে সখ্য তৈরি হয় এবং গান রেকর্ড হয়।
সবচেয়ে আবেগের অংশ ছিল হাশিম মাহমুদকে যুক্ত করা। অসুস্থতার কারণে আগে তাঁকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু এবার কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও তিনি গানে যুক্ত হতে পেরেছেন। ইমনের মতে, এটি তাঁর জীবনের অন্যতম বড় সাফল্য।
বেঙ্গল সিম্ফনি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ইমন ও তাঁর বন্ধুদের তৈরি সংগীতদল বেঙ্গল সিম্ফনি, যেখানে প্রায় ২০ জন সদস্য রয়েছেন। দেশের ভেতরে-বাইরে পারফর্ম করার পাশাপাশি তাঁরা প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ অ্যালবামে থাকবে ছয়টি গান।
চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্রের সংগীতে ইমন সমানভাবে সক্রিয়। মায়া: দ্য লস্ট মাদার চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া কাঠবিড়ালী, রাত জাগা ফুল, গুণিন, পরাণ, সুড়ঙ্গ, অন্তর্জাল, দেয়ালের দেশসহ বিভিন্ন সিনেমায় তাঁর সংগীত শোনা গেছে।
ইমন বলেন, “আমি শিখতে চাই, জানার চেষ্টা করি। মানুষ আমার কিছু কাজ পছন্দ করছে—এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তবে দায়িত্বও বেড়ে গেছে।”
জাতীয় পুরস্কার বিজ্ঞাপনচিত্র থেকে চলচ্চিত্র ও নাটক, ইমনের ব্যস্ততা সারা বছর। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তিনি। শ্রোতৃপ্রিয়তার সঙ্গে তাঁর কাজগুলো সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছে। ২০২২ সালে মায়া: দ্য লস্ট মাদার চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এ ছাড়া কাঠবিড়ালী, রাত জাগা ফুল, গুণিন, পরাণ, সুড়ঙ্গ, অন্তর্জাল থেকে দেয়ালের দেশ সিনেমায় পাওয়া গেছে তাঁকে। ইমন বলেন, ‘আমি সংগীতের তেমন কিছুই জানি না। তবে শেখার চেষ্টা করি। আমার কিছু কাজ মানুষের পছন্দের তালিকায় আছে, এটা আমার জন্য অনেক। এর ফলে দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে কয়েকটি সিনেমার কাজ শেষ করেছি, আরও কিছু কথা চলছে, সবকিছু মিলিয়ে চলতি বছর চলচ্চিত্রেও শ্রোতারা আমাকে পাবেন।’
এনপিবি/ এ আর
মন্তব্য করুন

