


মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার ৭৪তম আসরে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন তানজিয়া জামান মিথিলা। থাইল্যান্ডের সেই মঞ্চে সৌন্দর্য নয়, আত্মবিশ্বাস ও পারফরম্যান্সে নজর কেড়েছেন তিনি। বিশ্বের ১২১ দেশের প্রতিযোগীর লড়াইয়ে মিথিলার নাম এখন আলোচনার তুঙ্গে। মিস ইউনিভার্স মঞ্চ থেকে এনপিবির সঙ্গে অন্তর্জালে কথা বলেছেন তানজিয়া জামান মিথিলা। সাক্ষাতকার নিয়েছেন শিবলী আহমেদ
শিবলী : প্রথমেই জানতে চাইব কেমন আছেন আপনি? বিদেশের মাটিতে বিদেশী হাওয়া-বাতাস, খাবার, তারওপর এত বড় মঞ্চে প্রতিযোগিতার ধকল, সব মিলিয়ে শরীর, স্বাস্থ্য ও মন ঠিক আছে তো?
মিথিলা : সত্যি বলতে একটু চাপ তো আছেই। প্রতিদিন রিহার্সাল, শ্যুট, Gym এসব করে রুমে আসা; ঘুমানোর জন্য মাত্র ৩-৫ ঘণ্টা পাওয়া। সব মিলিয়ে মাঝে মাঝে দুর্বল হয়ে পড়ি। তবে যখন দেখি আমার দেশ থেকে এতো মানুষ আমাকে ভালোবাসছে, আমাকে নিয়ে গর্ব করছে, তখন মনে হয়ে এতো কষ্ট করা আমার সার্থক।
শিবলী : এত চরম প্রতিযোগিতা, এর মধ্যে কে আপনাকে সবচেয়ে বেশি মানসিক সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে? সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে জোগাচ্ছেন আপনাকে?
মিথিলা : আমার মা। উনি সবসময়ই আমার প্রেরণার উৎস। ১৬ বছর বয়সে একমাত্র মায়ের প্রেরণাতেই বাল্যবিবাহ কাটিয়ে ঢাকা পাড়ি জমিয়েছিলাম। নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে আমার মায়ের অন্যতম ভূমিকা ছিলো। আরো একবার সেই মায়ের অনুপ্রেরণাতেই আমি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছি।
শিবলী : পরিবারের লোকেদের কথা মনে পড়ছে? পরিবারের লোকেদের সঙ্গে কিংবা দেশের বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে কথা বলার অবসর পাচ্ছেন?
মিথিলা : যেমনটা বলছিলাম, এখন আমার কাছে শ্বাস নেওয়ার পর্যন্ত সময় নেই। বাংলাদেশের জন্য কিছু করতে হবে। তবে হ্যাঁ, সবার কথাই মনে পড়ে। হয়তো প্রতিদিন কথা বলা হয়ে উঠছে না। তবে তারাও জানে আমি তাদের, সর্বপরি দেশের নাম উজ্জ্বল করার জন্যই কাজ করে যাচ্ছি।
শিবলী : নানান দেশ থেকে প্রতিযোগীরা এসেছেন। তাদের কারো সঙ্গে কি আপনার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে? অন্যান্য প্রতিযোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারো বিশেষ গুণ কি আপনাকে প্রভাবিত করেছে?
মিথিলা : সবাই খুবই আন্তরিক। এখানে আমরা শুধু একটি প্রতিযোগীতায় আসিনি; একে অপরের কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এসেছি। একজনের নাম আমি উল্লেখ করতে চাই- তিনি হচ্ছেন মিস ভিয়েতনাম। উনি খুবই অমায়িক একজন মানুষ। তার জীবনের সকল বাধা পেরিয়ে তিনি যে Miss Universe এ প্রথম বিচিত্র পরিচয়ের মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তা সত্যি আমার জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।
শিবলী : প্রতিযোগিতার মঞ্চে কিংবা মঞ্চের বাইরে এই কয়দিনে এমন বিশেষ কিছু কি ঘটেছে, যা আপনার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে?
মিথিলা : দেশে এতো সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষ যে আমাকে ভোট দিয়ে এতো দীর্ঘ সময় আমাকে টপে রেখেছে, সেটা সারাজীবন আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। Miss Universe এর মুকুট জিতি বা না জিতি; আমি আসল মুকুট জিতে গিয়েছি-সেটা হচ্ছে আমার দেশের মানুষের ভালোবাসা।
শিবলী : দেশে আপনাকে নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। আবার প্রশংসায়ও ভাসছেন আপনি। কেউ কেউ ঘোলা জ্বলে মাছ শিকার করতে গিয়ে আপনাকে ধার্মীক নারীদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। একজন সিনিয়র ও স্বনামধন্য জার্নালিস্ট আপনার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন— 'মোল্লা নারীদের হাত থেকে সৃষ্টিকর্তা মিথিলাকে রক্ষা করুক'। এই যে তিনি আপনাকে একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিলেন, এটা দেশের বুকে আপনার জন্য নেতিবাচক হয়ে দাঁড়াবে কি না? আপনি নিজে তো কাউকে কটাক্ষ করেননি। কিন্তু আপনার হয়ে কেউ একজন ধর্মীয় নারীদের কটাক্ষ করেছে। এটা দেশের মানুষের কাছে আপনার ইমেজকে প্রবলেমে ফেলবে কিনা?
মিথিলা : আমি অন্য কারো কথার দায়ভার নিতে রাজি নই। উনি যা বলেছেন তা সম্পূর্ণই উনার ব্যাপার। বাংলাদেশে অনেক ধরণের মানুষ বসবাস করে,আর খুবই সহনশীলতার সাথে দীর্ঘদিন যাবত বসবাস করে আসছে। আপনি একটু লক্ষ করলে দেখতে পাবেন আমাকে অনেক ধার্মিক মানুষও সাপোর্ট করছে; আবার বিপরীত ধরণের মানুষেরাও আমাকে নিয়ে সমালোচনা করছে। দিনশেষে আমরা সবাই বাংলাদেশী। সবাইকে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
শিবলী : দেশে ফিরে সিনেমার পর্দায় নিয়মিত নায়িকা হয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে কিনা?
মিথিলা : অবশ্যই। তবে অভিনয়ে ঢোকার আগে আমি Acting Class এ ভর্তি হব। এদিকে আমার একটু প্রশিক্ষণের দরকার আছে। অভিনয় একটা শিল্প, আমি মিস বাংলাদেশ- মানে এই না যে আমি অভিনয়েও দক্ষ। যদিও আমি অভিনয় করেছি আগে, তবে এদিকটায় আমার আরো শেখার প্রয়োজন আছে।
শিবলী : দেশের মানুষকে এই মুহূর্তে কী বলার আছে আপনার?
মিথিলা : সবাই এক হয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যান। আমি মিস ইউনিভার্সে ইতিহাস সৃষ্টির খুবই কাছাকাছি।আপনাদের ভালোবাসা ছাড়া আমার জন্য এটা একা করা সম্ভব হবে না। তাই সবাই আমাকে ভোট করতে থাকুন ১৯ তারিখ পর্যন্ত।
শিবলী : দেশের মানুষকে কীভাবে সার্ভ করার ইচ্ছা আছে আপনার?
মিথিলা : ২০১৬ সাল থেকে আমি ‘Rising Star’ নামক একটি অরগানাইজেশনের সাথে কাজ করছি। আমরা দরিদ্র মানুষদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফান্ড সংগ্রহ ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করে আসছি। আমার এই কাজকেই আমি মিস ইউনিভার্সে আমার প্রজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করেছি; যেখানে SDG 2: খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আমার কাজে আমি মিস ইউনিভার্স Organisation কে যুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাবো- যেনো আমাদের কাজ আরো বড় পরিসরের পরিচালিত হয়।
শিবলী : দেশের বড় বড় তারকারা আপনার জন্য ভোট চাইছে। এই বিষয়টি কি আপনাকে আনন্দ দিচ্ছে। এই বিষয়টি আপনার আবেগকে কীভাবে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে?
মিথিলা : অবশ্যই এটা আমার জন্য একটা বিশাল অর্জন। আমরা শিল্পীরা যে একে অন্যের প্রয়োজনে এক হয়ে দাঁড়াতে পারি, এটা সেটার একটি বড় উদাহরণ। সবার জন্য আমার পক্ষ থেকে প্রাণঢালা ভালোবাসা রইলো। অবশ্যই আপনারা ভবিষ্যতেও আমার পাশে এভাবেই থাকবেন।
শিবলী : আমাদেরকে এতটা সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক বেশি ধন্যবাদ।
মিথিলা : আপনাদেরও অনেক ধন্যবাদ আমাকে কিছু কথা বলার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
মন্তব্য করুন