

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় দিন। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে প্রথম প্রদর্শিত হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বাংলা সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’।
ছবিটির শুভ উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। এই একটি সিনেমার হাত ধরেই এ দেশের নিজস্ব চলচ্চিত্র শিল্পের সুসংগঠিত যাত্রা শুরু হয়েছিল, তাই ৩ আগস্টকে বাংলাদেশের সিনেমার জন্মদিন হিসেবেও গণ্য করা হয়।
'মুখ ও মুখোশ' প্রমাণ করেছিল যে, হাজারো প্রতিকূলতা জয় করেও এ দেশের মাটিতে বাংলা ভাষায় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব।
একটি ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ ও আবদুল জব্বার খানের অদম্য স্বপ্ন
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এ অঞ্চলে নিজস্ব কোনো চলচ্চিত্র শিল্প ছিল না; এখানকার প্রেক্ষাগৃহে কলকাতা, লাহোর বা হলিউডের ছবি চলত।
১৯৫৩ সালে এক সভায় অবাঙালি হল মালিক খানবাহাদুর ফজল আহমেদ দাবি করেন, পূর্ব পাকিস্তানের আর্দ্র আবহাওয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই অযৌক্তিক মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান নাট্যকর্মী আবদুল জব্বার খান এবং চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ঘোষণা দেন যে তিনি এখানেই পূর্ণাঙ্গ বাংলা সিনেমা বানিয়ে দেখাবেন।
চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রযুক্তিগত জ্ঞান কিংবা পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল অদম্য স্বপ্ন ও সাহসের ওপর ভর করে তিনি মাঠে নেমে পড়েন।
অসীম প্রতিকূলতা জয় ও ইতিহাস সৃষ্টির পেছনের গল্প
চ্যালেঞ্জ জেতার পর শুরু হয় সীমাহীন সংগ্রামের গল্প। আবদুল জব্বার খান তার লেখা জনপ্রিয় 'ডাকাত' নাটকটিকে চিত্রনাট্য বানান এবং কলকাতা থেকে পাঁচ হাজার টাকায় একটি পুরোনো, মরিচা ধরা আইমো ক্যামেরা কিনে আনেন।
সেই সময়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী শিল্পী পাওয়া কঠিন হওয়ায় সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে জহরত আরা, পিয়রী বেগম (নাজমা) এবং পূর্ণিমা সেনগুপ্ত যুক্ত হন। ঢাকা ও এর আশপাশের নদী, ধানখেত ও জঙ্গলে দুই বছর শুটিংয়ের পর ল্যাব সুবিধা না থাকায় লাহোর থেকে নেগেটিভ ডেভেলপ করে আনা হয়।
অবশেষে ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনায় ছবিটি মুক্তি পায় এবং দর্শকদের অভূতপূর্ব সাড়া পেয়ে ইতিহাসের সৃষ্টি হয়।
৭০ বছরের পথচলা: গৌরবোজ্জ্বল অতীত ও বর্তমান সংকট
বিগত সাত দশকে বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় দেশে বছরে শতাধিক সিনেমা তৈরি হতো এবং ১,৭০০টিরও বেশি প্রেক্ষাগৃহ ছিল, কিন্তু সেই সোনালী দিন এখন অতীত।
বর্তমানে নিয়মিত চালু থাকা সিনেমা হলের সংখ্যা কমে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টিতে ঠেকেছে। যদিও বর্তমানে আধুনিক ক্যামেরা, বিশ্বমানের সাউন্ড ও ভিএফএক্স সুবিধা ঢাকায় রয়েছে, তবুও মূল সংকট দাঁড়িয়েছে ভালো গল্প, শক্তিশালী চিত্রনাট্য এবং দূরদর্শী নির্মাতার অভাবে।
আশার আলো ও চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সংকট সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ নির্মাতাদের হাত ধরে আবারও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দেড়-দুই কোটি টাকা বাজেটে তৈরি অনেক বিনোদনধর্মী ও মানসম্মত ছবি ব্যবসা সফল হওয়ার পাশাপাশি দর্শকদের নতুন করে প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনছে।
'মুখ ও মুখোশ'-এর ৭০ বছর পূর্তিতে আয়োজিত বিভিন্ন উৎসবে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ভালো গল্পের আবেদন কখনো শেষ হয় না।
সঠিক কনটেন্ট তৈরি এবং সারা দেশে আধুনিক সিনেপ্লেক্স নির্মাণে সরকারি সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।