


সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ব্যাংকিং কার্যক্রমকে গতিশীল করতে উদ্যোগ নিয়েছে নবগঠিত বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। ক্ষুদ্র বা স্বল্প আমানতকারীদের জন্য শুরুতেই সুখবর নিয়ে এসেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এখন থেকে জরুরি প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন গ্রাহকরা। যা আগে ছিল সরেবোচ্চ ২ লাখ। ব্যাংক সূত্র এ তথ্য জানা গেছে।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র আজ এনপিবিকে জানায়, আমানত ফেরতের জন্য একটি ধাপভিত্তিক স্কিম নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। ছয় মাস পর আরও ১ লাখ টাকা এবং এর প্রতি তিন মাস পরপর ১ লাখ টাকা করে উত্তোলনের সুযোগ থাকবে। এভাবে দুই বছরের মধ্যে আমানত ফেরতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে বৃহৎ আমানতকারীদের জন্য আপাতত কোনো নীতি গ্রহণ করতে পারেনি ব্যাংকটি। সূত্রমতে, কয়েক কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত রয়েছে—এমন গ্রাহকদের পুরো অর্থ এই সময়ের মধ্যে ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো অবস্থান নেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের।
এদিকে চেকবই ব্যবহারে জটিলতা তৈরি হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের। ব্যাংকটির নিজস্ব একীভূত চেকবই এখনো চালু না হওয়ায় গ্রাহকরা আগের ব্যাংকের চেক দিয়েই অর্থ উত্তোলন করছেন। এতে বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্য যাচাই ও সমন্বয়ের কারণে লেনদেনে অতিরিক্ত সময় লাগছে এবং অনেক শাখায় ধীরগতি দেখা দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পাঁচটি ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম সম্পূর্ণ একীভূত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে এক্সিম ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি তথ্য সংরক্ষণ ও পরিচালনার জন্য সিটি ব্যাংকের আধুনিক ডাটা সেন্টার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে লেনদেনের গতি বাড়বে, সিস্টেম আরও স্থিতিশীল হবে এবং গ্রাহকদের ভোগান্তি কমবে।
পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক বাস্তবতা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এমন পাঁচটি ব্যাংককে নিয়ে গঠিত, যেগুলো গত কয়েক বছরে তারল্য সংকট, উচ্চ খেলাপি ঋণ, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং ব্যাপক অনিয়মের কারণে গভীর সংকটে পড়ে। একসময় এসব ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে, যার ফলে আমানতকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকার বেশি। তবে এই সম্পদের একটি বড় অংশই ঋণ হিসেবে আটকে রয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপি বা আদায়-অনিশ্চিত।
ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে একাধিকবার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়ন এবং আন্তঃব্যাংক সহায়তা ছাড়া অনেক সময় স্বাভাবিক লেনদেন পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একীভূতকরণের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য শুধু প্রশাসনিক ব্যয় কমানো নয়; বরং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও দায় একত্র করে একটি কার্যকর আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যাতে মূলধন শক্তিশালী হয়, পরিচালন ব্যয় কমে এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ উদ্ধার
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে মূলত তিনটি বিষয়। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়। এসব খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত না এলে এই ব্যাংকটি গঠন করার উদ্দেশ্য সফল হবে না।
দ্বিতীয়ত, তারল্য সংকট কাটিয়ে নিয়মিত আমানত ফেরতের সক্ষমতা অর্জন। তৃতীয়ত পাঁচটি ব্যাংকের প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত পূর্ণাঙ্গ একীভূতকরণ।যতদিন পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায় না হবে, ততদিন বড় অঙ্কের আমানত ফেরত দেওয়া কঠিন হবে। কারণ ব্যাংকের নগদ প্রবাহ মূলত ঋণ আদায়ের ওপরই নির্ভরশীল।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এক্সিম ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহার, সিটি ব্যাংকের ডাটা সেন্টারের সুবিধা গ্রহণ এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের উদ্যোগ ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এতে গ্রাহকসেবা সহজ হবে এবং দৈনন্দিন লেনদেনের জটিলতা অনেকটাই কমে আসবে।
তবে ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি বড় আমানতকারীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট অর্থ ফেরতের রোডম্যাপ, খেলাপি ঋণ উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে আস্থা পুরোপুরি ফিরবে না। আর এই তিনটি ক্ষেত্রেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান এনপিবি নিউজকে বলেন, 'গ্রাহকদের কথা মাথায় রেখেই এই ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা হয়েছে। যেসব আমানতকারীরা এই ব্যাংকগুলোতে আমানত রেখেছেন সবার আমানত ফেরত দিতে খুবই ইতিবাচক কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমরা চাই না কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। সে লক্ষ্যেই গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশা করছি বড় আমানতাকারীদের ব্যাপারেও খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত আসবে।'