


আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন।
দীর্ঘ ৩৩ বছর পর হতে যাওয়া জাকসু নির্বাচন নিয়ে সম্প্রতি এনপিবি নিউজের বিশেষ আয়োজন ‘এনপিবি ক্যাম্পাস টক’-এ কথা বলছেন প্রর্থীরা। জানিয়েছেন, নির্বাচনী আবহওয়ায় উৎসাহ-উদ্দীপনার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনপিবি নিউজের স্টাফ রিপোর্টার মাজহার ইমন।
প্রথম পর্বে জাকসু নির্বাচনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সমর্থিত ‘সংশপ্তক পর্ষদ’প্যানেল থেকে যুগ্ম- সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদের প্রার্থী সোহাগী সামিয়া।
প্রশ্ন- নির্বাচনী পরিবেশ কেমন দেখছেন? প্রার্থী হিসেবে প্রত্যাশার কথা জানান।
সোহাগী সামিয়া- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে জাকসু নির্বাচনের দাবিতে সবসময়ই আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। দীর্ঘ প্রত্যাশার পর আমরা জাকসু নির্বাচন পাচ্ছি; যা ঘিরে আমাদের অনেক স্বপ্ন রয়েছে, প্রত্যাশা রয়েছে। আসলে প্রতিটি শিক্ষার্থীদেরই স্বপ্ন আর প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু একদম নির্বাচনী দোরগোড়ায় এসেছি, খুব শিগগিরই নির্বাচন হচ্ছে। এইমুহুর্তে এসে মনে হচ্ছে আমাদের যেই আশা-প্রত্যাশা ছিলো, তা কিছুটা ব্যহত হচ্ছে বলে মনে করছি। কারণ- যেমন জাকসু আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, তেমন জাকসু নির্বাচনী মাঠ আমরা দেখতে পারছি না। আমরা দেখছি অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীরা টাকার ছড়াছড়ি করছে। আমরা দেখছি জাবির মতো স্থানে নারী প্রার্থীদের উপস্থিতি কম, ২২ শতাংশেরও নীচে। মেয়েদের ১০টি হলের মধ্যে ৫টি হলেই নারী প্রার্থী নেই বললেই চলে। এদিকে যারা (নারী) কেন্দ্রীয় পদগুলোতে দাঁড়িয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রত্যেক মুহুর্তে সাইবার বুলিং, আক্রমণ, ট্যাগিং এখন পর্যন্ত চলছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে এগুলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়ার কথা না, তবুও হচ্ছে। এবং আরও দুঃখের বিষয় হচ্ছে নির্বাচন কমিশন বা জাবির প্রক্টরিয়াল বডি এসব বিষয়ে কোনো সমাধান এখনও আমাদের দিতে পারছে না।
প্রশ্ন- নির্বাচনে টাকার ছড়াছড়ি, নারীদের বুলিং করাসহ যেসমস্ত অভিযোগের কথা আপনি বললেন তা নিয়ে আপনারা সংশ্লিষ্টদে কাছে গিয়েছেন? অভিযোগ জানানো এবং ব্যবস্থা নেয়ার বিষয় সব মিলিয়ে একজন প্রার্থী হিসেবে কিভাবে দেখছেন?
সোহাগী সামিয়া- শুধু আমরা না, অনেকেই গিয়েছেন কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান করছে না প্রশাসন। সে কারণে আমরা খুব হতাশ হয়েছি। আমরা ৩৩ বছর পরে একটি উৎসবমুখর-স্বচ্ছ-সুন্দর-সহবস্থান এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে একটি নির্বাচন করতে পারবো ভেবেছিলাম। কিন্তু সেখানে আমাদের স্বপ্ন বেশ ভালোভাবেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
প্রশ্ন- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা। তবে আজকের দিন পর্যন্ত ক্যম্পাসে গবেষণার বিষয়গুলো কতোটুকু এগোলো আর আপনি নির্বাচিত হলে এ নিয়ে কি কাজ করবেন?
সোহাগী সামিয়া- জাবিতে গবেষণা যে মাত্রায় হওয়ার কথা ছিলো তাতো হয়নি, বরং একটা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যতটুকু গবেষণার পরিবেশ থাকার কথা ছিলো ততটুকুও নেই। প্রত্যেকটা বিভাগের গবেষণার জন্যই বরাদ্দ-সুযোগসুবিধা প্রয়োজন হয়। সেগুলো খুব’ই কম। আরও যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হলো- প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি, সেটাও দেখা যাচ্ছে না। বিজ্ঞান অনুষদের জন্য যেমন বরাদ্দ-সুযোগ রয়েছে, তা সমাজ ও কলা অনুষদের জন্য তা অনেক কম। গবেষণার জন্য প্রয়োজন হয়, এমন প্রায় সকলকিছুই শিক্ষার্থীকেই কিনতে হয়। দক্ষ গবেষকেরও স্বল্পতা রয়েছে। ল্যাবের সুযোগসুবিধাও কম। আমরা নির্বাচিত হলে এসমস্ত সমস্যা সমাধানে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করবো। প্রতিটি শিক্ষার্থী যাতে গবেষণার জন্য সম্পূর্ণ সাপোর্ট পায় সে বিষয়ে আমরা কাজ করবো।
প্রশ্ন- জাকসুতে এবার ৪৯ শতাংশ নারী ভোটার, তাদের জন্য আপনাদের বিশেষ বার্তা কি? এছাড়া এবার ছয়টি পদ শুধু নারীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, যেখানে শুধু তারাই ভোট করবেন- এ বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?
সোহাগী সামিয়া- জাকসুতে নারীদের জন্য পদ বরাদ্দ বলা হচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। এখানে নারীদের পদগুলোর সঙ্গে পুরুষের জন্যই একই পদ রয়েছে। জাবিতে এমন কোনো চিন্তা আসার কথা ছিলো না; যে নারীরা পিছিয়ে যাচ্ছে, তাই তাদের সামনে এগিয়ে আনতে হবে। জাহাঙ্গীরনগরের যে চেহারা ছিলো, শুরু থেকে এই ক্যাম্পাসে আন্দোলন-সংগ্রামসহ সবক্ষেত্রেই নারীদের অবদান বেশি ছিলো। নারীদের নেতৃত্ব বেশি ছিলো। কিন্তু এই সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ২২ শতাংশের নীচে। এর কারণ হচ্ছে নারীদের জন্য সেই ক্যাম্পাস তৈরি করা হয় নাই। আমি জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলাম। আমাকে মানুষ দেখছে, আমি কি পেয়েছি? প্রাপ্য হিসেবে গালিগালাজ ছাড়া, বুলিং ছাড়া কিছুই পাইনি এই ক্যম্পাস থেকে। এসব কারণে বিভিন্ন অবস্থানে থাকা নারীরা এখানে আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় বলছেন ট্যাগিংয়ের ভয়ে, বুলিংয়ের ভয়ে তারা নির্বাচনে আসছেন না। নারীদের সঙ্গে যেসমস্ত অন্যায় হচ্ছে তার প্রতিটির বিচার করা হোক। এতে ক্যম্পাসের নারীরা সহস পাবেন এবং সকল কর্মকাণ্ডে সব নারীরা আপনাআপনি সামনে চলে আসবেন।
প্রশ্ন- জাবিতেও ছাত্র রাজনীতি-শিক্ষক রাজনীতি বিদ্যমান। নানান কর্মসূচি থাকে, কার্যক্রম থাকে ক্রিয়াশীল সংগঠনগুলোর। এসব নিয়ে নির্বাচনী পরিবেশে কোনো বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে কিনা?
সোহাগী সামিয়া- নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমেই অনেক শঙ্কার তৈরি হয়। নির্বাচনের ৪ দিন আগে এসে একজন ভিপি প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল করা হয়েছে। সকল নিয়ম সম্পন্ন করে যা গত ২৯ আগস্টের মধ্যে করার কথা ছিলো। যা আমাদের মধ্যে ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে। মনে হচ্ছে কোনো রকমের ষড়যন্ত্র, অন্যরকম উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা? যদি আমাদের মনে করাটা ভুল হলে আমরাই সবচেয়ে বেশি খুশি হবো। একইভাবে চরমভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি অমান্য করা হচ্ছে, কিন্তু প্রশাসন কিছুই বলছে না। যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা, যেহেতু এমনটা হচ্ছে না; তাই আমরা মনে করছি প্রশাসন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমাদের শিক্ষকরাও ন্যায়ের পক্ষে রয়েছেন। আমরা শিক্ষকদের দোষ দিতে চাই না। তবে ছাত্র শিবিরের হয়ে কয়েকজন শিক্ষক ফেসবুকে পোস্ট করেছেন এবং আচরণবিধি অমান্য করেছেন। শিক্ষকদের এমন কর্মকাণ্ড অপ্রত্যাশিত। সে বিএনপি-জামায়াত-বাম বা যে দলেরই হোক বা সাধারণ শিক্ষকই হোক এমন কাজ করবেন তা সত্যিই প্রত্যাশিত নয়।
প্রশ্ন- জাহাঙ্গীরনগর মুক্ত ক্যম্পাস হিসেবে এর নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে। সেই মুক্তিযুদ্ধকে লালন ও ধারণ করে কতোটুকু চলতে পাড়ছেন? নির্বাচনী পরিবেশকেও যুক্ত করে জানতে চাই।
সোহাগী সামিয়া- খুবই কষ্ট লাগে। জাকসু নির্বাচন করছি বুকের মধ্যে পাথর চাপা দিয়ে। যেই জাকসুর যাত্রা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের হাত ধরে, সেখানে ৩৩ বছর পর আজ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি। এর থেকে কলঙ্কের ও দুঃখের বিষয় বোধহয় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আর হবে না। জামায়াত মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধী ছিলো। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও শিবির যেই কর্মকাণ্ডগুলো করেছে, তার মাধ্যমেও স্পষ্ট বুঝিয়েছে তারা মুক্তিযুদ্ধকে লালন করে না। তারা সেই রাজাকারদেরকেই লালন করে। সেই বিরোধী শক্তির অংগ্রহণে হচ্ছে জাকসু নির্বাচন, যা আমাদের দুঃখের বিষয় হিসেবে থাকবে। স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে আমাদের লড়াই চলমান থাকবে।
প্রশ্ন- সবশেষে জানতে চাই এবারের জাকসু ভোটারদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কি?
সোহাগী সামিয়া- ভোটারদের বলতে চাই- দীর্ঘ ৩৩ বছর পর জাকসুতে ভোট হচ্ছে। এটি শুধুমাত্র নির্বাচন নয়, শুধুই ভোট নয়। ভোট আপনার অধিকার আদায়ের কথা বলবে। আপনি ভেবেচিন্তে ভোট দিবেন এইজন্য যে, যিনি নির্বাচিত হবেন আগামী একবছর তার সকল সিদ্ধান্ত আপনাকে মানতে হবে। যিনি আপনার অধিকার নিয়ে কাজ করবেন তাকেই ভোট দিন। এবং দয়া করে ভোটের মাঠ ছেড়ে চলে যাবেন না। মূল্যবান ভোটই ক্যম্পাসের পরিবেশকে বদলে দিতে পারে।
মন্তব্য করুন