

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে স্বস্তিতে নেই নির্বাচনের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াতের কেউই। বিএনপির প্রধান সংকট তাদের দুই শক্তিশালী ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। আর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে একেক সময় একেক দল থেকে প্রার্থী করার বিষয়টি। প্রথমে জোটের প্রার্থী ছিলেন খেলাফত মজলিসের নেতা। শেষ সময়ে এসে তিনি জামায়াতের ‘উন্মুক্ত প্রার্থী’র কারণে বাদ পড়ায় মনঃক্ষুণ্ন খেলাফতের নেতাকর্মীরা।
এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান। এতে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম এবং মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে লড়াইয়ে আছেন।
গিয়াসউদ্দিন আগে পাশের নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ইতোমধ্যে রেজাউল করিম ও গিয়াসউদ্দিনের পক্ষে কাজ করার জন্য ২৬ জন বিএনপি নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে এ আসনের বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রবল দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, ধানের শীষের ভোট এখন তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। দুই ‘বিদ্রোহী’কে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তাদের বিপুলসংখ্যক অনুসারী রয়েছেন। দুজনই সাবেক এমপি এবং প্রভাবশালী নেতা। ফলে ভোটের বাক্সে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান, ১১ দলীয় জোট মনোনীত জামায়াতের প্রার্থী প্রিন্সিপাল ড. মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী অঞ্জন দাস, গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী ওয়াহিদুর রহমান মিল্কি, জনতার দলের প্রার্থী আব্দুল করিম মুন্সি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী আতিকুর রহমান নান্নু এবং দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন।
তবে বিএনপি, দুই স্বতন্ত্র এবং জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই মূল লড়াই হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনে চর্তুমুখী লড়াইয়ের সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।
জামায়াত জোটে প্রার্থী জটিলতা
জামায়াত এ আসনে দলীয়ভাবে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছিল দলের নেতা ড. মো. ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়াকে। পরে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রার্থী হন খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ শাহজাহান। তিনি এ হিসেবে এতদিন প্রচার চালাচ্ছিলেন। তবে প্রচার শুরুর কিছুদিন পরেই নিজেকে ‘উন্মুক্ত প্রার্থী’ দাবি করে মাঠে সক্রিয় হন জামায়াতের ড. ইকবাল। এ নিয়ে জোটের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা দেয়। খেলাফত নেতা শাহজাহান বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি জানান। ড. ইকবাল ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এক জোটের দুই প্রার্থীর দ্বন্দ্বের মধ্যে রোববার খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ফতুল্লা এলাকায় নির্বাচনী জনসভায় গিয়ে জোটের প্রার্থী হিসেবে ড. ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করেন। এমন নাটকীয়তার পর নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে গেছেন খেলাফতের শাহজাহান ও তাঁর অনুসারীরা।
এ আসনে এনসিপি নেতা কেন্দ্রীয় যুবশক্তির যুগ্ম সমন্বয়ক মোহাম্মদ তুহিন মাহমুদ প্রকাশ্যে জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে মাঠে রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে জামায়াত প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করেন নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। যদিও জোটের নেতাকর্মীরা বলছেন, প্রার্থী নিয়ে এমন নাটকীয়তা ও খেলাফত নেতাকর্মীর ক্ষোভের প্রভাব ব্যালটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিবেচনায় আওয়ামী লীগের ভোট
উভয় দল ও জোট আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ভোট টানার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির তিনবারের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমকে প্রায় এক লাখ ভোটে পরাজিত করেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী কায়সার হাসনাত। এবার ভোটের মাঠে অনুপস্থিত থাকলেও আওয়ামী লীগের একটি বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে এ আসনে, যা নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোট নিজের পক্ষে টানতে প্রার্থীরা নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান তাঁর নির্বাচনী সমাবেশে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি নির্বাচিত হলে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীর নামে মামলা দেওয়া হবে না। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও আওয়ামী লীগের ভোট নিজের দিকে টানার জন্য দলটির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে জানা গেছে। পিছিয়ে নেই জামায়াতের প্রার্থী ড. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়াও। তিনিও কৌশলী বক্তব্যের মাধ্যমে আওয়ামী সমর্থকদের ভোট পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জয়ের বিষয়ে আশাবাদী প্রার্থীরা
বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, ধানের শীষের বিজয় হলে এ দেশের নিপীড়িত মানুষের বিজয় হবে। গত ১৭ আন্দোলন-সংগ্রাম
করে দলকে সংগঠিত করেছি। সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জের মানুষ আমার ত্যাগের মূল্যায়ন করে সব দলের লোকজন আমাকে ভোট নির্বাচিত করবেন বলে আশা করি।
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, আমি এ আসনে চারবারের এমপি ছিলাম। দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের পাশে থেকে এলাকার উন্নয়ন করেছি। এ উন্নয়নের মূল্যায়ন হিসেবে মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে। অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন বলেন, একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি হিসেবে আমি সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জে সবার কাছে পরিচিত মুখ। আগেও সংসদে ছিলাম। অভিজ্ঞতার বিবেচনায় আমাকে সাধারণ মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন বলে আশা রাখি।
জামায়াতের প্রার্থী ড. মো. ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া বলেন, মানুষ উচ্চশিক্ষিত, সৎ ও যোগ্য হিসেবে আমাকে মূল্যায়ন করবেন। দীর্ঘ সময় ধরে এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঠ চষে বেড়িয়েছি। দীর্ঘ সময় প্রচারে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। সেই হিসেবে তারা ভোট দিয়ে আমাকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিবেন বলে মনে করি।
ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ও সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে নির্বাচনী এলাকায় প্রচার-প্রচারণা করে যাচ্ছেন। দলীয় লোকজন ছাড়াও সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৮৩ হাজার ৯৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৯৬ হাজার ৭৪৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৮৭ হাজার ২০৪ জন। দুজন হিজড়া ভোটার রয়েছেন।
মন্তব্য করুন