


বরগুনা-১ (সদর-আমতলী–তালতলী) আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ না থাকা এবং দলটি নিষিদ্ধ থাকায় মাঠে নেই তাদের প্রার্থী ও সাংগঠনিক কার্যক্রম।
এতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বরগুনা-১ আসনে তৈরি হয়েছে ভোট দখলের লড়াই। তবে এই লড়াইয়ে আওয়ামী লীগের ভোটারদের সমর্থন পেতে মাঠে সক্রিয় বিএনপি ও চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
মূল প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগের বিপুল ভোটব্যাংক কার দখলে যাবে? বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী নিয়ে গঠিত বরগুনা-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৯ হাজার ৪৫৯ জন।
পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৬০ হাজার ৩৫১ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১১ জন। বরগুনা সদর ১০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত, মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১ জন।
আমতলী উপজেলা ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত, ভোটার সংখ্যা ১ লক্ষ ৮৪ হাজার ৮৪৮।
তালতলী উপজেলা ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত, ভোটার সংখ্যা ৮৭ হাজার ২০। ৩ উপজেলার এই বিশাল ভোটারদের বেশিরভাগ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত ছিলো৷ তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দৃশ্যপট পালটে জল গড়িয়েছে অনেক দূর।
শীর্ষ নেতারা পলাতক, কেউবা রয়েছেন জেলে। মামলায় জর্জরিত নেতা-কর্মীদের রাজনীতিতে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় নেই৷
তবে তৃণমূলের সাধারণ কর্মী ও ভোটারদের বেশিরভাগই বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দলটির অনুপস্থিতিতে এই কর্মী-সমর্থকদের ভোটগুলো কোন দিকে যাবে, সেটিই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক এবার একমুখী হবে না। মধ্যপন্থী ভোটের একটি অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারে। আবার ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে একটি অংশ ইসলামী আন্দোলনের দিকে যেতে পারে।
একই সঙ্গে একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তারা ভোট কেন্দ্রে গেলে ভোটের হিসেব পালটে যেতে পারে। বিএনপি এই আসনকে নিজেদের জন্য সুযোগ হিসেবে দেখছে।
দলটি ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা সামনে রেখে প্রচারণা চালিয়েছে। বেগম জিয়ার মৃত্যু, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে পূর্ণদায়িত্ব পাওয়ায় নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন করে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা ব্যাপক বাড়ানো হয়েছে।
সাবেক আওয়ামী লীগ সমর্থক ও নিরপেক্ষ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোই বিএনপির অন্যতম লক্ষ্য বলে একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
বরগুনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও দলের মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম মোল্লা ‘এনপিবি’-কে বলেন, রাজনীতির মাঠে বিএনপির পরীক্ষিত নেতা হিসেবে আমি জনগণের পাশে ছিলাম। উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও জনঅধিকার প্রতিষ্ঠায় আজও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে, আমি দলকে এই আসনটি উপহার দিতে চাই। বরগুনাকে উন্নয়নে এগিয়ে নিতে চাই।
অন্যায়, অত্যাচার ও লুটপাটের রাজনীতি বরগুনা থেকে চিরতরে নির্মূল করতে চাই। সাধারণ মানুষ ও নতুন প্রজন্ম আমার প্রতি আস্থা রেখে, ইনশাল্লাহ ভোট দিয়ে আমাকে বিজয়ী করবে।"
অপরদিকে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বাজিমাত করার স্বপ্ন দেখছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তারা ইসলামী শাসনব্যবস্থা, নৈতিকতা ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের কথা বলে ধর্মপ্রাণসহ সকল ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।
স্থানীয়ভাবে চরমোনাই নেতারা আশা করছেন, আওয়ামী লীগের ভোটের একটি বড় অংশ তাদের দিকে যাবে।
এরইমধ্যে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট রাজনীতির বাইরে থেকে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে এককভাবে মাঠে রয়েছে। মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় মাহফিলকেন্দ্রিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তারা ধারাবাহিকভাবে ভোটার সংযোগ বাড়িয়েছে।
তরুণ ও কওমি ধারা, সনাতন ভোটারদের মধ্যে দলটির প্রভাব দিন দিন বাড়ছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা হচ্ছে।
সেক্ষেত্রে চরমোনাই মনোনীত প্রার্থী মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এমন কি আওয়ামীপন্থী ভোটারের একটা অংশ এরই মধ্যে তার পক্ষে মাঠে সক্রিয় হওয়ার গুঞ্জন রয়েছে।
জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ ‘এনপিবি’ কে বলেন, "আমরা জয়ের লক্ষ্যে মাঠে সক্রিয়ভাবে কাজ করছি। আমাদের সঙ্গে কোনো দলের সংঘাত নাই, তাই আওয়ামী লীগের ভোটও আমরা পাবো বলে বিশ্বাস করি।
বিগত দিনে ভোটের স্বাধীনতা থেকে বার বার আমরা বঞ্চিত হয়েছি। এবারের নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট হলে সকল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীক নিয়ে আমি বিজয়ী হবো।”
বরগুনা–১ আসনের নির্বাচন এবার শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত ভোটব্যাংক দখলের প্রতিযোগিতা।
প্রায় সাড়ে ৫ লাখ ভোটারের এই আসনে কারা এগিয়ে থাকবে, তা নির্ভর করবে ভোটার উপস্থিতি, মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট ব্যবহারের সিদ্ধান্তের ওপর। উপকূলীয় এই আসনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও বার্তা দিতে পারে বলে ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
প্রসঙ্গত, বরগুনা-১ (বরগুনা সদর-আমতলী-তালতলী) আসনে ৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মোল্লা এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ।
এ আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৫ লাখ ১৯ হাজার ৪৫৯ জন। এদের মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৬০ হাজার ৩৫১ জন। এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭ জন। পোস্টাল ভোটার রয়েছেন ৬ হাজার ২৯৮ জন। আসনটিতে মোট ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১৯০টি।
মন্তব্য করুন