মঙ্গলবার
১১ আগস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
১১ আগস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এসএসসি’র ফলাফলে ধস, কারণ নিয়ে নানা মত

এনপিবি নিউজ
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এবার পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। গত ১৯ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে হঠাৎ এমন ফল কেন?

শিক্ষা প্রশাসন বলছে, এবার খাতা মূল্যায়নে বাড়তি নম্বর দেওয়ার প্রবণতা ছিল না। শিক্ষার্থীরা যে নম্বর পেয়েছে, সেটিই দেওয়া হয়েছে। আগের বছরগুলোতে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে যে শিথিলতা ছিল, এবার তা ছিল না।

তবে শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, কেবল মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন দিয়ে এবারের ফল ব্যাখ্যা করা কঠিন। শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বিদ্যালয়ের পরিবেশ, পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল ফল—সব মিলিয়েই এবারের ফল তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল প্রায় সোয়া ১৮ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন।

গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তা কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২২ হাজারের বেশি।

তবে এই ফলকে ‘বিপর্যয়’ বলতে নারাজ শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তাদের যুক্তি, আগের বছরগুলোর ফলের সঙ্গে তুলনা করলে এবার পাসের হার কম মনে হচ্ছে। কিন্তু এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষার্থীর প্রকৃত পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানও ফলকে স্বাভাবিক বলছেন। তার মতে, অতীতে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়ানোর যে প্রবণতা ছিল, এবার সেটি ছিল না।

শিক্ষা প্রশাসনের এই বক্তব্যের সঙ্গে শিক্ষাবিদদের একটি অংশও একমত। তাদের মতে, দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে ফল ভালো দেখানোর প্রবণতা থাকলে হঠাৎ বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়নে পাসের হার কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।

এবারের ফল বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট। ইংরেজি ও গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা সামগ্রিক ফলকে প্রভাবিত করেছে।

বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে দেখা যায়, এসব বিষয়ে পাসের হার অনেক ক্ষেত্রেই ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী এই দুই বিষয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাস করেছে ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। সিলেটে এ হার ৬৯ দশমিক ১১ শতাংশ এবং বরিশালে ৬৯ দশমিক ২৪ শতাংশ।

গণিতেও কিছু বোর্ডে পাসের হার তুলনামূলক কম। ময়মনসিংহে গণিতে ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং দিনাজপুরে ৭১ দশমিক ০৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।

এবারের পরীক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষাজীবনও ছিল পরিবর্তনের মধ্যে। নবম শ্রেণিতে তারা এক ধরনের নতুন শিক্ষাক্রমে পড়েছে। পরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই শিক্ষাক্রম বাতিল করা হয়। দশম শ্রেণিতে তাদের জন্য আবার পরিবর্তিত শিক্ষাক্রমের বই দেওয়া হয়। অর্থাৎ একই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের দুই শ্রেণিতে দুই ধরনের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে।

শিক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে পড়েছে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনায় দুর্বল, তাদের জন্য এক শিক্ষাপদ্ধতি থেকে আরেকটিতে যাওয়ার বিষয়টি বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে সবাই বিষয়টিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন না। কয়েকজন শিক্ষকের মতে, পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন থাকলেও বিষয়বস্তুর বড় অংশে ধারাবাহিকতা ছিল। ফলে নিয়মিত পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় বাধা হওয়ার কথা নয়।

এবার পরীক্ষাকেন্দ্রেও ছিল বাড়তি নজরদারি। সিসিটিভির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরে ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থাও ছিল।

শিক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এতে পরীক্ষাকেন্দ্রে অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ আরও কমেছে। আগে কোনো শিক্ষার্থী হয়তো বন্ধুর কাছ থেকে একটি-দুটি বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর দেখে নিতে পারত। এবার সেই সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়েছে। এর ফলে যারা নিজের প্রস্তুতির বাইরে সামান্য সহায়তার ওপর নির্ভর করত, তাদের একটি অংশ এবার সেই সুবিধা পায়নি।

পরীক্ষার পরিবেশ সুষ্ঠু রাখার দিক থেকে এটি ইতিবাচক। তবে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে পাসের হার কিছুটা কমে থাকতে পারে বলে মনে করছেন কয়েকজন শিক্ষক।

এবার পরীক্ষার আগে শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, অযাচিত নম্বর দেওয়া যাবে না। খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।

শিক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই নির্দেশ পরীক্ষকদের মূল্যায়নেও প্রভাব ফেলেছে। আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা বেশি সতর্ক ছিলেন।

ফলে যে শিক্ষার্থী ৩৩ বা তার বেশি নম্বর পাওয়ার মতো উত্তর দিতে পারেনি, তাকে শুধু পাস করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কমে থাকতে পারে।

এবারের ফলাফলকে একটি মাত্র কারণে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। একদিকে খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা এসেছে। অন্যদিকে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা রয়েছে। একই সময়ে পরীক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষাজীবনে শিক্ষাক্রম পরিবর্তন হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে শিক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। এর সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি যুক্ত হয়েছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন